অধ্যায় 03 মানবতা

মৈথিলীশরণ গুপ্ত
সন ১৮৮৬-১৯৬৪

১৮৮৬ সালে ঝাঁসির নিকট চিরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণকারী মৈথিলীশরণ গুপ্ত তাঁর জীবদ্দশাতেই ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা বাড়িতেই হয়েছিল। সংস্কৃত, বাংলা, মারাঠি ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর সমান অধিকার ছিল।

গুপ্তজী রামভক্ত কবি। রামের কীর্তিগান তাঁর চিরসংবদ্ধ আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি ভারতীয় জীবনকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে ও উপস্থাপন করারও চেষ্টা করেছেন।

গুপ্তজীর কবিতার ভাষা বিশুদ্ধ খাড়ি বোলি। ভাষার উপর সংস্কৃতের প্রভাব রয়েছে। কাব্যের কাহিনী ভারতীয় ইতিহাসের এমন অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে যা ভারতের অতীতের স্বর্ণচিত্র পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে।

গুপ্তজীর প্রধান রচনাগুলি হল- সাকেত, যশোধরা, জয়দ্রথ বধ।

গুপ্তজীর পিতা সেঠ রামচরণ দাসও কবি ছিলেন এবং তাঁর ছোট ভাই সিয়ারামশরণ গুপ্তও প্রসিদ্ধ কবি হয়েছিলেন।

পাঠ প্রবেশ

প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের মধ্যে চেতনা-শক্তির প্রাবল্য থাকে বৈকি। সে শুধু নিজের নয়, অন্যের হিতাহিতেরও খেয়াল রাখতে, অন্যদের জন্যও কিছু করতে সক্ষম হয়। পশুরা চারণভূমিতে যায়, নিজ নিজ ভাগের ঘাস খেয়ে আসে, কিন্তু মানুষ তা করে না। সে যা উপার্জন করে, যা কিছু উৎপাদন করে, তা অন্যদের জন্যও করে, অন্যদের সহযোগিতায় করে।

প্রস্তুত পাঠের কবি আপনজনদের জন্য বেঁচে থাকা-মরা মানুষদের মানুষ তো মানেন কিন্তু এটা মানতে রাজি নন যে এমন মানুষের মধ্যে মানবতার পূর্ণ লক্ষণও রয়েছে। তিনি তো সেই মানুষদেরই মহান মনে করবেন যাদের মধ্যে নিজের ও আপনজনের হিত চিন্তার থেকে অনেক আগে এবং সর্বোপরি অন্যের হিত চিন্তা হয়। তার মধ্যে সেই গুণগুলো থাকবে যার কারণে কোনো মানুষ এই মৃত্যুলোক থেকে চলে যাওয়ার পরেও যুগ যুগ ধরে অন্যদের স্মৃতিতে থেকে যায়। তার মৃত্যুও সুমৃত্যু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই গুণগুলো কী?

মানবতা

বিচার করো যে মর্ত্য হও মৃত্যু থেকে ভয় করো না কখনো,
মরো, কিন্তু এমনভাবে মরো যাতে সকলে স্মরণ করে।
এভাবে সুমৃত্যু না হলে বৃথা মরলে, বৃথা বেঁচে থাকলে,
সে মরে নি যে নিজের জন্য বেঁচে থাকল না।
সেই পশু-প্রবৃত্তি যে নিজে নিজেই চরে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে॥

সেই উদারের কাহিনী সরস্বতী বর্ণনা করেন,
সেই উদার থেকে পৃথিবী কৃতার্থ ভাব মানে।
সেই উদারের সদা সজীব কীর্তি কুজন করে;
এবং সেই উদারকে সমস্ত সৃষ্টি পূজা করে।
অখণ্ড আত্মভাব যে অসীম বিশ্বে ভরে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে॥

ক্ষুধার্ত রন্তিদেব দিয়েছিলেন হাতে থাকা থালও,
এবং দধীচি দিয়েছিলেন পরার্থে অস্থিজালও।
উশীনর ক্ষিতীশ নিজমাংস দানও করেছিলেন,
সহর্ষে সেই কর্ণ শরীর-চর্মও দিয়েছিলেন।
অনিত্য দেহের জন্য অনাদি জীব কেন ভয় পাবে?
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে॥

সহানুভূতি চাই, মহাবিভূতি এটাই;
বশীকৃতা সদাই আছে বনী হয়ে স্বয়ং মহী।

বিরুদ্ধবাদ বুদ্ধের দয়া-প্রবাহে ভেসে গেল,
বিনীত লোকসমূহ কি না সামনে নুয়ে রইল?
আহা! সেই উদার যে পরোপকার করে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে।।

থেকো না ভুলে কখনো গর্বে অন্ধ তুচ্ছ বিত্তে,
সনাথ জান নিজেকে করো না গর্ব চিত্তে।
অনাথ কে আছে এখানে? ত্রিলোকনাথ সঙ্গে আছেন,
দয়ালু দীনবন্ধুর বড়ো বিশাল হাত আছেন।
অতিভাগ্যহীন যে অধীর ভাব করে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে।।

অনন্ত অন্তরীক্ষে অনন্ত দেবতা দাঁড়িয়ে আছেন,
সমক্ষেই স্ববাহু যা বাড়িয়ে দিচ্ছেন বড়ো বড়ো।
পরস্পর অবলম্বনে উঠো এবং বাড়ো সকলে,
এখনই অমর্ত্য-অঙ্কে অপঙ্ক হয়ে চড়ো সকলে।
থেকো না এমনভাবে যে একের থেকে না কাজ অন্যটির সারবে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে।।

‘মানুষ মাত্র বন্ধু’ এটাই বড়ো বিবেক,
পুরাণপুরুষ স্বয়ম্ভূ পিতা প্রসিদ্ধ এক।
ফলানুসারে কর্মের অবশ্য বাহ্য ভেদ আছে,
কিন্তু অন্তরৈক্যে প্রমাণভূত বেদ আছে।
অনর্থ যে বন্ধুই না বন্ধুর ব্যথা হরে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে।।

চলো অভীষ্ট পথে সহর্ষে খেলতে খেলতে,
বিপত্তি, বিঘ্ন যা পড়ে সেগুলো ঠেলতে ঠেলতে।
কমে না হেলমেল হ্যাঁ, বাড়ে না ভিন্নতা কখনো,
অতর্ক এক পথের সতর্ক পন্থী হোন সকলে।
তখনই সমর্থ ভাব যে তরিয়ে দিয়ে তরবে,
সেই মানুষ যে মানুষের জন্য মরে।।

প্রশ্ন-অভ্যাস

(ক) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও-

1. কবি কীভাবে মৃত্যুকে সুমৃত্যু বলেছেন?

2. উদার ব্যক্তির পরিচয় কীভাবে হতে পারে?

3. কবি দধীচি, কর্ণ প্রভৃতি মহান ব্যক্তিদের উদাহরণ দিয়ে ‘মানবতা’-র জন্য কী বার্তা দিয়েছেন?

4. কবি কোন পংক্তিগুলিতে এটা প্রকাশ করেছেন যে আমাদের গর্ব-বিহীন জীবন যাপন করা উচিত?

5. ‘মানুষ মাত্র বন্ধু’ থেকে তুমি কী বুঝ? স্পষ্ট করো।

6. কবি সকলে এক হয়ে চলার প্রেরণা কেন দিয়েছেন?

7. ব্যক্তির কীভাবে জীবন যাপন করা উচিত? এই কবিতার ভিত্তিতে লেখো।

8. ‘মানবতা’ কবিতার মাধ্যমে কবি কী বার্তা দিতে চান?

(খ) নিম্নলিখিতগুলির ভাব স্পষ্ট করো-

1. সহানুভূতি চাই, মহাবিভূতি এটাই;

বশীকৃতা সদাই আছে বনী হয়ে স্বয়ং মহী।
বিরুদ্ধবাদ বুদ্ধের দয়া-প্রবাহে ভেসে গেল,
বিনীত লোকসমূহ কি না সামনে নুয়ে রইল?

2. থাকো না ভুলে কখনো গর্বে অন্ধ তুচ্ছ বিত্তে,
সনাথ জান নিজেকে করো না গর্ব চিত্তে।
অনাথ কে আছে এখানে? ত্রিলোকনাথ সঙ্গে আছেন,
দয়ালু দীনবন্ধুর বড়ো বিশাল হাত আছেন।

3. চলো অভীষ্ট পথে সহর্ষে খেলতে খেলতে,
বিপত্তি, বিঘ্ন যা পড়ে সেগুলো ঠেলতে ঠেলতে।
কমে না হেলমেল হ্যাঁ, বাড়ে না ভিন্নতা কখনো,
অতর্ক এক পথের সতর্ক পন্থী হোন সকলে।

যোগ্যতা বিস্তার

1. তোমার শিক্ষকের সাহায্যে রন্তিদেব, দধীচি, কর্ণ প্রভৃতি পুরাণিক চরিত্রদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করো।

2. ‘পরোপকার’ বিষয়ে ভিত্তি করে দুটি কবিতা ও দুটি দোহার সংকলন করো। সেগুলো শ্রেণিকক্ষে শোনাও।

প্রকল্প কাজ

1. অযোধ্যা সিংহ উপাধ্যায় ‘হরিঔধ’-এর কবিতা ‘কর্মবীর’ এবং অন্যান্য কবিতাগুলি পড়ো এবং শ্রেণিকক্ষে শোনাও।

2. ভবানী প্রসাদ মিশ্রের ‘প্রাণী সেই প্রাণী’ কবিতা পড়ো এবং উভয় কবিতার ভাবগুলিতে প্রকাশিত সমতা লেখো।

শব্দার্থ এবং টিপ্পনী

মর্ত্য - মরণশীল
পশু-প্রবৃত্তি - পশুর মতো স্বভাব
উদার - দানশীল / সদয়
কৃতার্থ - কৃতজ্ঞ / ধন্য
কীর্তি - যশ
কূজতি - মধুর ধ্বনি করে
ক্ষুধার্ত - ক্ষুধায় ব্যাকুল
রন্তিদেব - একজন পরম দানী রাজা
করস্থ - হাতে ধরা / নেওয়া
দধীচি - একজন প্রসিদ্ধ ঋষি যাঁর হাড় থেকে ইন্দ্রের বজ্র তৈরি হয়েছিল
পরার্থ - যা অন্যের জন্য হয়
অস্থিজাল - হাড়ের সমষ্টি
উশীনর - গান্ধার দেশের রাজা
ক্ষিতীশ - রাজা
স্বমাংস - নিজের শরীরের মাংস
কর্ণ - দান করার জন্য প্রসিদ্ধ কুন্তীপুত্র
মহাবিভূতি - বড়ো ভারী পুঁজি
বশীকৃতা - বশে করা
বিরুদ্ধবাদ বুদ্ধের
দয়া-প্রবাহে ভেসে গেল - বুদ্ধ করুণাবশত সেই সময়ের প্রথাগত বিশ্বাসের বিরোধ করেছিলেন
মদান্ধ - যে গর্বে অন্ধ
বিত্ত - ধন-সম্পত্তি
পরস্পর অবলম্বন - একে অপরের সাহায্য
অমর্ত্য-অঙ্ক - দেবতার কোল
অপঙ্ক - কলঙ্ক-বিহীন
স্বয়ম্ভূ - পরমাত্মা / স্বয়ং উৎপন্ন হওয়া
অন্তরৈক্য - আত্মার একতা / অন্তরের একতা
প্রমাণভূত - সাক্ষী
অভীষ্ট - ইচ্ছিত
অতর্ক - তর্কের অতীত
সতর্ক পন্থী - সতর্ক যাত্রী