অধ্যায় ০৬ পদ

রবিদাস (১৩৮৮-১৫১৮)

রবিদাস নামে খ্যাত সন্ত রবিদাসের জন্ম সন ১৩৮৮ এবং দেহাবসান সন ১৫১৮ সালে বনারসেই হয়েছিল, এমনটাই মনে করা হয়। তাঁর খ্যাতিতে প্রভাবিত হয়ে সিকান্দর লোদী তাঁকে দিল্লি আসার নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। মধ্যযুগীন সাধকদের মধ্যে রবিদাসের বিশেষ স্থান রয়েছে। কবীরের মতো রবিদাসও সন্ত শ্রেণীর কবি হিসেবে গণ্য হন। মূর্তিপূজা, তীর্থযাত্রা ইত্যাদি আড়ম্বরে রবিদাসের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না। তিনি ব্যক্তির আন্তরিক অনুভূতি এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বকেই প্রকৃত ধর্ম বলে মনে করতেন।

রবিদাস তাঁর কাব্য-রচনায় সরল, ব্যবহারিক ব্রজভাষার প্রয়োগ করেছেন, যাতে অযোধ্যা, রাজস্থানি, খড়ি বোলি এবং উর্দু-ফারসি শব্দের মিশ্রণও রয়েছে। রবিদাসের কাছে উপমা ও রূপক অলঙ্কার বিশেষ প্রিয় ছিল। সোজাসাপ্টা পদে সন্ত কবি হৃদয়ের ভাব অত্যন্ত সাফল্যের সাথে প্রকাশ করেছেন। তাঁর আত্মনিবেদন, দৈন্য ভাব এবং সহজ ভক্তি পাঠকের হৃদয়কে আলোড়িত করে। রবিদাসের চল্লিশটি পদ শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘গুরুগ্রন্থ সাহেব’-এর অন্তর্ভুক্ত।

এখানে রবিদাসের দুটি পদ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পদ ‘প্রভু জী, তুম চন্দন হম পানি’-তে কবি তাঁর আরাধ্যকে স্মরণ করে তাঁর সাথে নিজের তুলনা করছেন। তাঁর প্রভু বাইরে কোথাও কোনো মন্দির বা মসজিদে বিরাজ করেন না বরং তাঁর নিজের অন্তরে সর্বদা বিদ্যমান থাকেন। তা ছাড়া, তিনি সব অবস্থায়, সব সময়ে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বগুণসম্পন্ন। এই কারণেই কবি তাঁর মতো হওয়ার প্রেরণা পান।

দ্বিতীয় পদে ভগবানের অপরিসীম উদারতা, কৃপা এবং তাঁর সমদর্শী স্বভাবের বর্ণনা রয়েছে। রবিদাস বলেন যে ভগবান তথাকথিত নিম্ন বংশের ভক্তদেরও সহজভাবে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের লোকসমাজে সম্মানজনক স্থান দিয়েছেন।

অব কৈসে ছূটৈ রাম নাম রট লাগী।
প্রভু জী, তুম চন্দন হম পানি, জাকী অং-অং বাস সমানী।
প্রভু জী, তুম ঘন বন হম মোরা, জৈসে চিতবত চন্দ চকোরা।
প্রভু জী, তুম দীপক হম বাতী, জাকী জোতি বরৈ দিন রাতী।
প্রভু জী, তুম মোতি হম ধাগা, জৈসে সোনহিং মিলত সুহাগা।
প্রভু জী, তুম স্বামী হম দাসা, ঐসী ভক্তি করৈ রবিদাসা।।

ঐসী লাল তুঝ বিনু কউনু করৈ।
গরীব নিবাজু গুসঈআ মেরা মাথৈ ছত্রু ধর ॥
জাকী ছোতি জগত কউ লাগৈ তা পর তুহীং ঢরৈ।
নীচহু ঊচ করৈ মেরা গোবিন্দু কাহূ তে ন ডরৈ।।
নামদেব কবীরু তিলোচনু সধনা সৈনু তরৈ।
কহি রবিদাসু সুনহু রে সন্তহু হরিজীউ তে সভৈ সংরৈ।।$ \qquad $

প্রশ্ন-অভ্যাস

১। নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দিন-

(ক) প্রথম পদে ভগবান এবং ভক্তের যে যে বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে, তার উল্লেখ করুন।

(খ) প্রথম পদের প্রতিটি পংক্তির শেষে অন্ত্যমিল শব্দের ব্যবহারে নাদ-সৌন্দর্য এসেছে, যেমন- পানি, সমানী ইত্যাদি। এই পদ থেকে অন্যান্য অন্ত্যমিল শব্দ বেছে লিখুন।

(গ) প্রথম পদে কিছু শব্দ অর্থের দৃষ্টিতে পরস্পর সংযুক্ত। এমন শব্দগুলো বেছে লিখুন।

উদাহরণ : দীপক C বাতী

(ঘ) দ্বিতীয় পদে কবি ‘গরীব নিবাজু’ কাকে বলেছেন? স্পষ্ট করুন।

(ঙ) দ্বিতীয় পদের ‘জাকী ছোতি জগত কউ লাগৈ তা পর তুহীং ঢরৈ’ এই পংক্তির অর্থ স্পষ্ট করুন।

(চ) ‘রবিদাস’ তাঁর স্বামীকে কোন কোন নামে ডেকেছেন?

(ছ) নিম্নলিখিত শব্দগুলির প্রচলিত রূপ লিখুন- মোরা, চন্দ, বাতী, জোতি, বরৈ, রাতী, ছত্রু, ঢরৈ, ছোতি, তুহীং, গুসঈআ

২। নীচে লেখা পংক্তিগুলির ভাব স্পষ্ট করুন-

(ক) জাকী অং-অং বাস সমানী

(খ) জৈসে চিতবত চন্দ চকোরা

(গ) জাকী জোতি বরৈ দিন রাতী

(ঘ) ঐসী লাল তুঝ বিনু কউনু করৈ

(ঙ) নীচহু ঊচ করৈ মেরা গোবিন্দু কাহূ তে ন ডরৈ

৩। রবিদাসের এই পদগুলির কেন্দ্রীয় ভাব নিজের ভাষায় লিখুন।

যোগ্যতা-বিস্তার

১। ভক্ত কবি কবীর, গুরু নানক, নামদেব এবং মীরাবাইয়ের রচনাগুলির সংকলন করুন।

২। পাঠে থাকা দুটি পদ মুখস্থ করুন এবং শ্রেণীকক্ষে গেয়ে শোনান।

শব্দার্থ এবং টীকা

বাস - গন্ধ, সুবাস
সমানী - সমানা (সুগন্ধির বসে যাওয়া), বাস করা (সমাহিত)
ঘন - মেঘ
মোরা - ময়ূর
চিতবত - দেখা, নিরীক্ষণ করা
চকোর - তিতির জাতির একটি পাখি যাকে চন্দ্রের পরম প্রেমিক বলে
মনে করা হয়
বাতী বাতি; তুলা, পুরনো কাপড় ইত্যাদি পাকিয়ে বা বেঁটে তৈরি
করা সরু পুঁতির মতো, যাকে তেলে ডুবিয়ে দীপ জ্বালানো হয়
জোতি - জ্যোতি, দেবতার প্রীতির জন্য জ্বালানো দীপ
বরৈ - বাড়ানো, জ্বলতে থাকা
রাতী - রাত্রি
সুহাগা সোনাকে শুদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত ক্ষারদ্রব্য
দাসা দাস, সেবক
লাল স্বামী
কউনু কে
গরীব নিবাজু - দীন-দুঃখীদের প্রতি দয়া কারী
গুসঈআ - স্বামী, গোসাঁই
মাথৈ ছত্রু ধরৈ - মস্তকে স্বামী হওয়ার মুকুট ধারণ করে
ছোতি - ছোঁয়াছুঁয়ি, অস্পৃশ্যতা
জগত কউ লাগৈ - সংসারের মানুষের লাগে
তা পর তুহীং ঢরৈ - তাদের প্রতি দ্রবীভূত হয়
নীচহু ঊচ করৈ - নীচকেও উঁচু পদবী প্রদান করে
নামদেব - মহারাষ্ট্রের একজন প্রসিদ্ধ সন্ত, তিনি মারাঠি ও হিন্দি উভয় ভাষায় রচনা করেছেন
তিলোচনু একজন প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব আচার্য, যিনি জ্ঞানদেব ও নামদেবের গুরু ছিলেন
সধনা একজন উচ্চ শ্রেণীর সন্ত যিনি নামদেবের সমসাময়িক বলে মনে করা হয়
সৈনু তিনিও একজন প্রসিদ্ধ সন্ত, আদি ‘গুরুগ্রন্থ সাহেব’-এ সংগৃহীত পদের ভিত্তিতে তাঁকে রামানন্দের সমসাময়িক মনে করা হয়
হরিজীউ হরি জী থেকে
সভৈ সংরৈ সব কিছু সম্ভব হয়ে যায়