অধ্যায় ১১ তেসরি কসমের শিল্পকার শৈলেন্দ্র
প্রহ্লাদ আগরওয়াল
সন ১৯৪৭
ভারতের স্বাধীনতার বছর মধ্য প্রদেশের জবলপুর শহরে জন্ম নেওয়া প্রহ্লাদ আগরওয়াল হিন্দি থেকে এম.এ. পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করেছেন। কিশোর বয়স থেকেই তার হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস এবং চলচ্চিত্রকারদের জীবন ও তাদের অভিনয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার এবং সে বিষয়ে আলোচনা করার শখ ছিল। এই দিনগুলোতে সতনার সরকারি স্বশাসিত স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন প্রহ্লাদ আগরওয়াল চলচ্চিত্র ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ক্ষেত্রকেই তার লেখার বিষয় বানিয়ে রাখার জন্য দৃঢ়সংকল্প। তার প্রধান রচনাগুলো হলো- সাতবাঁ দশক, তানাশাহ, ম্যাঁয় খুশবু, সুপার স্টার, রাজকাপুর : আধি হকীকত আধা ফসানা, কবি শৈলেন্দ্র : জিন্দেগী কী জীত মেঁ ইয়াকীন, পিয়াসা : চির অতৃপ্ত গুরুদত্ত, উত্তাল উমং : সুভাষ ঘইয়ের চলচ্চিত্রকলা, ও রে মাঝি : বিমল রায়ের সিনেমা এবং মহাবাজারের মহানায়ক : ইক্কিশভোঁ সদীর সিনেমা।
পাঠ প্রবেশ
বছরের কোনো মাসের সম্ভবতই কোনো শুক্রবার এমন যায় না যখন কোনো না কোনো হিন্দি চলচ্চিত্র পর্দায় না পৌঁছায়। এর মধ্যে কিছু সফল হয় তো কিছু ব্যর্থ। কিছু দর্শক কিছু সময়ের জন্য মনে থাকে, কিছুকে তারা সিনেমাঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে যায়। কিন্তু যখন কোনো চলচ্চিত্রকার কোনো সাহিত্যিক রচনাকে পুরো নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পর্দায় তুলে ধরে তখন তার চলচ্চিত্র কেবল স্মরণীয়ই হয়ে ওঠে না বরং মানুষের মনোরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কোনো ভালো বার্তা দিতেও সফল হয়।
এক গীতিকার হিসেবে কয়েক দশক ধরে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকা কবি ও গীতিকার যখন ফণীশ্বরনাথ রেণুর অমর রচনা ‘তেসরি কসম উর্ফ মারে গয়ে গুলফাম’কে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেন তখন তা মাইলফলক সাব্যস্ত হয়। আজও তার গণনা হিন্দির কিছু অমর চলচ্চিত্রের মধ্যে করা হয়। এই চলচ্চিত্র কেবল তার গান, সঙ্গীত, গল্পের কারণে খ্যাতি পায়নি বরং এতে তার সময়ের সবচেয়ে বড় শোম্যান রাজকাপুর তার চলচ্চিত্র জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট অভিনয় করে সবাইকে বিস্মিত করে দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের নায়িকা ওয়াহিদা রহমানও তেমন অভিনয়ই করে দেখিয়েছিলেন যেমনটি তার থেকে আশা করা হয়েছিল।
এই অর্থে একটি স্মরণীয় চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও ‘তেসরি কসম’কে আজ এই কারণেও স্মরণ করা হয় কারণ এই চলচ্চিত্রের নির্মাণ এটাও প্রকাশ করে দিয়েছিল যে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে একটি সার্থক ও উদ্দেশ্যমূলক চলচ্চিত্র বানানো কতটা কঠিন ও ঝুঁকির কাজ।
তেসরি কসমের শিল্পকার শৈলেন্দ্র
‘সংগম’ এর অভূতপূর্ব সাফল্য রাজকাপুরের মধ্যে গভীর আত্মবিশ্বাস ভরে দিয়েছিল এবং সে একসঙ্গে চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিল- ‘মেরা নাম জোকার’, ‘অজন্তা’, ‘ম্যাঁয় এবং মেরা দোস্ত’ এবং ‘সত্য শিব সুন্দরম’। কিন্তু যখন ১৯৬৫ সালে রাজকাপুর ‘মেরা নাম জোকার’ এর নির্মাণ শুরু করল তখন সম্ভবত সে এই কল্পনাও করেনি যে এই চলচ্চিত্রের একটি অংশ বানাতে ছয় বছরের সময় লাগবে।
এই ছয় বছরের ব্যবধানে রাজকাপুর অভিনীত বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল, যার মধ্যে সন ১৯৬৬ সালে প্রদর্শিত কবি শৈলেন্দ্রের ‘তেসরি কসম’ও অন্তর্ভুক্ত। এটি সেই চলচ্চিত্র যাতে রাজকাপুর তার জীবনের সর্বোত্তম ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটাই নয়, ‘তেসরি কসম’ সেই চলচ্চিত্র যা হিন্দি সাহিত্যের একটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী রচনাকে সেলুলয়েডে পুরো সার্থকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিল। ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্র নয়, সেলুলয়েডে লেখা কবিতা ছিল।
‘তেসরি কসম’ শৈলেন্দ্রের জীবনের প্রথম ও শেষ চলচ্চিত্র। ‘তেসরি কসম’ ‘রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক’ পেয়েছিল, বঙ্গ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি দ্বারা সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং আরও কয়েকটি পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছিল। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবেও এই চলচ্চিত্র পুরস্কৃত হয়েছিল। এর শৈল্পিকতার দীর্ঘ-চওড়া প্রশংসা হয়েছিল। এতে শৈলেন্দ্রের সংবেদনশীলতা পুরো তীব্রতার সঙ্গে উপস্থিত। তিনি এমন চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন যাকে সত্যিকারের কবি-হৃদয়ই বানাতে পারত।
শৈলেন্দ্র রাজকাপুরের অনুভূতিকে শব্দ দিয়েছেন। রাজকাপুর তার একান্ত সহযোগীর চলচ্চিত্রে ততটাই নিবিষ্টতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন, কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা না করে। শৈলেন্দ্র লিখেছিলেন যে তিনি রাজকাপুরের কাছে ‘তেসরি কসম’ এর গল্প শোনাতে পৌঁছালে গল্প শুনে তিনি বড় উৎসাহের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীরভাবে বললেন- “আমার পারিশ্রমিক অ্যাডভান্স দিতে হবে।” শৈলেন্দ্রের এমন আশা ছিল না যে রাজকাপুর জীবনভরের বন্ধুত্বের এই প্রতিদান দেবেন। শৈলেন্দ্রের ম্লান মুখ দেখে রাজকাপুর হেসে বললেন, “বের করো এক টাকা, আমার পারিশ্রমিক! পুরো অ্যাডভান্স।” শৈলেন্দ্র রাজকাপুরের এই ইয়ারানা মস্তির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু একজন নির্মাতা হিসেবে বড় বাণিজ্যিক বিচক্ষণতাসম্পন্নরাও চক্কর খেয়ে যান, তারপর
শৈলেন্দ্র তো চলচ্চিত্র-নির্মাতা হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য ছিলেন। রাজকাপুর একজন ভালো ও সত্যিকারের বন্ধুর অবস্থান থেকে শৈলেন্দ্রকে চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কও করেছিলেন। কিন্তু তিনি তো একজন আদর্শবাদী ভাবুক কবি ছিলেন, যার অপরিমিত সম্পদ ও যশের ততটা কামনা ছিল না যতটা আত্ম-সন্তুষ্টির সুখের আকাঙ্ক্ষা ছিল। ‘তেসরি কসম’ যতই মহান চলচ্চিত্র হোক না কেন, কিন্তু এটি একটি দুঃখজনক সত্য যে এটি প্রদর্শনের জন্য খুব কষ্টে বিতরণকারী পাওয়া গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও যে ‘তেসরি কসম’ এ রাজকাপুর ও ওয়াহিদা রহমানের মতো নামকরা তারকা ছিলেন, শঙ্কর-জয়কিশনের সঙ্গীত ছিল, যাদের জনপ্রিয়তা সেই দিনগুলোতে সপ্তম আকাশে ছিল এবং এর গানও চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের পূর্বেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কিন্তু এই চলচ্চিত্র কিনতে চায় এমন কেউ ছিল না। আসলে এই চলচ্চিত্রের সংবেদনা কোনো দুই থেকে চার বানানোর অঙ্ক জানা ব্যক্তির বোধের বাইরে ছিল। তাতে রচিত-বসা করুণা দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা যায় এমন জিনিস ছিল না। এই কারণেই খুব কষ্টে যখন ‘তেসরি কসম’ মুক্তি পেল তখন এর কোনো প্রচার হয়নি। চলচ্চিত্র কখন এল, কখন চলে গেল, জানাই পড়ল না।
এমন নয় যে শৈলেন্দ্র বিশ বছর ধরে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা সত্ত্বেও সেখানকার রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু তাতে জড়িয়ে পড়ে তিনি তার মানুষিয়ত হারাতে পারেননি। ‘শ্রী ৪২০’ এর একটি জনপ্রিয় গান হলো- ‘পেয়ার হুয়া, ইকরার হুয়া হ্যায়, পেয়ার সে ফির ক্যুঁ ডরতা হ্যায় দিল।’ এর অন্তরার একটি পংক্তি- ‘রাতে দসোঁ দিশাওঁ সে কহেঙ্গী আপনী কাহানিয়াঁ’ -তে সঙ্গীতকার জয়কিশন আপত্তি করেছিলেন। তার ধারণা ছিল যে দর্শক ‘চার দিশা’ তো বুঝতে পারে- ‘দশ দিশা’ নয়। কিন্তু শৈলেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হননি। তার দৃঢ় মত ছিল যে দর্শকদের রুচির আড়ালে আমাদের উচ্ছলতাকে তাদের ওপর চাপানো উচিত নয়। শিল্পীর এই কর্তব্যও যে সে ভোক্তার রুচির পরিশোধন করার চেষ্টা করবে। এবং তার বিশ্বাস ভুল ছিল না। এটাই নয়, তিনি খুব ভালো গানও যা তিনি লিখেছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। শৈলেন্দ্র মিথ্যা অভিজাত্য কখনো গ্রহণ করেননি। তার গান ভাব-প্রবণ ছিল- দুরূহ নয়। ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি, ইয়ে পতলুন ইংলিস্তানি, সর পে লাল টোপি রুসি, ফির ভী দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ - এই গান শৈলেন্দ্রই লিখতে পারতেন। শান্ত নদীর প্রবাহ এবং সমুদ্রের গভীরতা নিয়ে। এই বিশেষত্বই তার জীবনের ছিল এবং এইটাই তিনি তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও প্রমাণ করেছিলেন।
‘তেসরি কসম’ যদি একমাত্র না হয় তবে কয়েকটি সেই চলচ্চিত্রের মধ্যে থেকে যেগুলো সাহিত্য-রচনার সঙ্গে শত-শতাংশ ন্যায় করেছে। শৈলেন্দ্র রাজকাপুরের মতো তারকাকে ‘হীরামন’ বানিয়ে দিয়েছিলেন। হীরামনের ওপর রাজকাপুর প্রভাবশালী হতে পারেননি। আর ছিঁটের সস্তা শাড়িতে জড়ানো ‘হীরাবাই’ ওয়াহিদা রহমানের প্রসিদ্ধ উচ্চতাকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছিল। কাজরী নদীর তীরে উবুড় হয়ে বসা হীরামন যখন গান গেয়ে হীরাবাইকে জিজ্ঞেস করে ‘মন সমঝতি হ্যাঁ ন আপ?’ তখন হীরাবাই জবান দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে কথা বলে। দুনিয়া-ভর শব্দ সেই ভাষাকে অভিব্যক্তি দিতে পারে না। এমনই সূক্ষ্মতায় স্পন্দিত ছিল- ‘তেসরি কসম’। নিজের মস্তিতে ডুবে ঝুমতে গাইতে গাড়োয়ান- ‘চলত মুসাফির মোহ লিয়ো রে পিঁজড়ে ওয়ালি মুনিয়া।’ টপ্পর-গাড়িতে হীরাবাইকে যেতে দেখে তার পিছনে দৌড়তে-গাইতে বাচ্চাদের হুজুম- ‘লালি-লালি ডোলিয়া মেঁ লালি রে দুলহনিয়া’, একটি নটনকির বাইয়ে আপনত্ব খুঁজে নেওয়া সরল হৃদয় গাড়োয়ান! অভাবের জীবন যাপন করা মানুষের স্বপ্নিল হাসি।
আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, লোক-তত্ত্বের অভাব। তারা জীবন থেকে দূরে থাকে। যদি ত্রাসদ অবস্থার চিত্রণ হয় তবে তাদের গৌরবান্বিত করা হয়। দুঃখের এমন বিকৃত রূপ উপস্থাপিত হয় যা দর্শকদের আবেগগত শোষণ করতে পারে। আর ‘তেসরি কসম’ এর এই বিশেষ বিষয় ছিল যে সে দুঃখকেও স্বাভাবিক অবস্থায়, জীবন-সাপেক্ষে উপস্থাপিত করে।
আমি শৈলেন্দ্রকে গীতকার নয়, কবি বলেছি। তিনি সিনেমার চকচক্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও যশ ও ধন-লিপ্সা থেকে ক্রোশ দূরে ছিলেন। যে কথা তার জীবনে ছিল সেইটাই তার গানেও। তার গানে শুধু করুণা নয়, সংগ্রামের ইঙ্গিতও ছিল এবং সেই প্রক্রিয়াও উপস্থিত ছিল যার মাধ্যমে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ব্যথা মানুষকে পরাজিত করে না, তাকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়।
শৈলেন্দ্র ‘তেসরি কসম’কে তার ভাবপ্রবণতার সর্বশ্রেষ্ঠ তথ্য প্রদান করেছিলেন। মুকেশের কণ্ঠে শৈলেন্দ্রের এই গান তো অতুলনীয় হয়ে উঠেছে-
সজনওয়া বৈরী হো গয়ে হামার, চিঠিয়া হো তো হর কোই বাঁচে, ভাগ ন বাঁচে কয়…
অভিনয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘তেসরি কসম’ রাজকাপুরের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চলচ্চিত্র। রাজকাপুর যাকে সমালোচক ও কলা-মর্মজ্ঞ চোখ দিয়ে কথা বলার শিল্পী মনে করেন, ‘তেসরি কসম’ এ মাসুমিয়তের চরম শিখর স্পর্শ করেন। অভিনেতা রাজকাপুর যতটা শক্তির সঙ্গে ‘তেসরি কসম’ এ উপস্থিত আছেন, ততটা ‘জাগতে রহো’ তেও নয়। ‘জাগতে রহো’ তে রাজকাপুরের অভিনয় খুব প্রশংসিত হয়েছিল, কিন্তু ‘তেসরি কসম’ সেই চলচ্চিত্র যাতে রাজকাপুর অভিনয় করে না। সে হীরামনের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। খালিস দেহাতি ভুচ্চ গাড়োয়ান যে শুধু দিলের জবান বোঝে, দিমাগের নয়। যার জন্য মোহব্বত ছাড়া অন্য কোনো জিনিসের কোনো অর্থ নেই। খুব বড় কথা হলো যে ‘তেসরি কসম’ রাজকাপুরের অভিনয়-জীবনের সেই মোকাম, যখন তিনি এশিয়ার সবচেয়ে বড় শোম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন। তার নিজের ব্যক্তিত্ব একটি কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ‘তেসরি কসম’ এ সেই মহিমাময় ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি হীরামনের আত্মায় নেমে গেছে। তিনি কোথাও হীরামনের অভিনয় করেন না, বরং নিজেই হীরামনে ঢলে গেছেন। হীরাবাইয়ের ফেনু-গিলাসি বুলিতে রীঝতে থাকা, তার ‘মনুয়া-নটুয়া’র মতো ভোলি সুরতের ওপর নিবেদিত হতে থাকা এবং হীরাবাইয়ের তনিক-সী উপেক্ষার ওপর নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সংগ্রাম করতে থাকা সত্যিকারের হীরামন হয়ে উঠেছেন।
‘তেসরি কসম’ এর চিত্রনাট্য মূল গল্পের লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণু নিজেই তৈরি করেছিলেন। গল্পের রেশা-রেশা, তার ছোট-থেকে-ছোট বাড়িকিয়াগুলো চলচ্চিত্রে পুরোপুরি নেমে এসেছিল।
প্রশ্ন-অভ্যাস
মৌখিক
নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর এক-দুই পংক্তিতে দিন-
1. ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্রকে কোন কোন পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে?
2. শৈলেন্দ্র কয়টি চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন?
3. রাজকাপুর দ্বারা পরিচালিত কিছু চলচ্চিত্রের নাম বলুন।
4. ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্রের নায়ক ও নায়িকাদের নাম বলুন এবং চলচ্চিত্রে এরা কোন চরিত্রের অভিনয় করেছেন?
5. চলচ্চিত্র ‘তেসরি কসম’ এর নির্মাণ কে করেছিলেন?
6. রাজকাপুর ‘মেরা নাম জোকার’ এর নির্মাণের সময় কোন বিষয়ের কল্পনাও করেননি?
7. রাজকাপুরের কোন কথায় শৈলেন্দ্রের মুখ ম্লান হয়ে গিয়েছিল?
8. চলচ্চিত্র সমালোচক রাজকাপুরকে কী ধরনের শিল্পী মনে করতেন?
লিখিত
(ক) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর ( ২৫-৩০ শব্দে ) লিখুন-
1. ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্রকে ‘সেলুলয়েডে লেখা কবিতা’ কেন বলা হয়েছে?
2. ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্রকে ক্রেতা কেন পাচ্ছিলেন না?
3. শৈলেন্দ্রের মতে শিল্পীর কর্তব্য কী?
4. চলচ্চিত্রে ত্রাসদ অবস্থার চিত্রণ গ্লোরিফাই কেন করে দেওয়া হয়?
5. ‘শৈলেন্দ্র রাজকাপুরের অনুভূতিকে শব্দ দিয়েছেন’–এই উক্তি থেকে আপনি কী বোঝেন? স্পষ্ট করুন।
6. লেখক রাজকাপুরকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় শোম্যান বলেছেন। শোম্যান থেকে আপনি কী বোঝেন?
7. চলচ্চিত্র ‘শ্রী ৪২০’ এর গান ‘রাতে দসোঁ দিশাওঁ সে কহেঙ্গী আপনী কাহানিয়াঁ’ -তে সঙ্গীতকার জয়কিশন আপত্তি কেন করেছিলেন?
(খ) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর ( ৫০-৬০ শব্দে ) লিখুন-
1. রাজকাপুর দ্বারা চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা সত্ত্বেও শৈলেন্দ্র এই চলচ্চিত্র কেন বানিয়েছিলেন?
2. ‘তেসরি কসম’ এ রাজকাপুরের মহিমাময় ব্যক্তিত্ব কীভাবে হীরামনের আত্মায় নেমে গেছে? স্পষ্ট করুন।
3. লেখক এমন কেন লিখেছেন যে ‘তেসরি কসম’ সাহিত্য-রচনার সঙ্গে শত-শতাংশ ন্যায় করেছে?
4. শৈলেন্দ্রের গানের কী কী বিশেষত্ব আছে? আপনার শব্দে লিখুন।
5. চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে শৈলেন্দ্রের বিশেষত্বের ওপর আলোকপাত করুন।
6. শৈলেন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ তার চলচ্চিত্রে ঝলকায়- কীভাবে? স্পষ্ট করুন।
7. লেখকের এই উক্তি থেকে যে ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্র কোনো সত্যিকারের কবি-হৃদয়ই বানাতে পারত, আপনি কতটা পর্যন্ত একমত? স্পষ্ট করুন।
(গ) নিম্নলিখিতের আভাস স্পষ্ট করুন-
1. …সে তো একজন আদর্শবাদী ভাবুক কবি ছিল, যার অপরিমিত সম্পদ ও যশেরও ততটা কামনা ছিল না যতটা আত্ম-সন্তুষ্টির সুখের আকাঙ্ক্ষা ছিল।
2. তার এই দৃঢ় মত ছিল যে দর্শকদের রুচির আড়ালে আমাদের উচ্ছলতাকে তাদের ওপর চাপানো উচিত নয়। শিল্পীর এই কর্তব্যও যে সে ভোক্তার রুচির পরিশোধন করার চেষ্টা করবে।
3. ব্যথা মানুষকে পরাজিত করে না, তাকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়।
4. আসলে এই চলচ্চিত্রের সংবেদনা কোনো দুই থেকে চার বানানো ব্যক্তির বোধের বাইরে।
5. তার গান ভাব-প্রবণ ছিল- দুরূহ নয়।
ভাষা অধ্যয়ন
1. পাঠে আসা ‘সে’ এর বিভিন্ন প্রয়োগ থেকে বাক্যের গঠন বুঝুন।
(ক) রাজকাপুর একটি ভালো ও সত্যিকারের বন্ধুর অবস্থান থেকে শৈলেন্দ্রকে চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার ঝুঁকি থেকে সতর্কও করেছিলেন।
(খ) রাতে দশ দিক থেকে বলবে নিজের কাহিনী।
(গ) চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা সত্ত্বেও সেখানকার রীতিনীতি থেকে অজ্ঞ ছিলেন।
(ঘ) আসলে এই চলচ্চিত্রের সংবেদনা কোনো দুই থেকে চার বানানোর অঙ্ক জানা ব্যক্তির বোধ থেকে বাইরে ছিল।
(ঙ) শৈলেন্দ্র রাজকাপুরের এই ইয়ারানা বন্ধুত্ব থেকে পরিচিত ছিলেন।
2. এই পাঠে আসা নিম্নলিখিত বাক্যগুলোর গঠনের দিকে মন দিন-
(ক) ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্র নয়, সেলুলয়েডে লেখা কবিতা ছিল।
(খ) তিনি এমন চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন যাকে সত্যিকারের কবি-হৃদয়ই বানাতে পারত।
(গ) চলচ্চিত্র কখন এল, কখন চলে গেল, জানাই পড়ল না।
(ঘ) খালিস দেহাতি ভুচ্চ গাড়োয়ান যে শুধু দিলের জবান বোঝে, দিমাগের নয়।
3. পাঠে আসা নিম্নলিখিত বাগধারাগুলো দিয়ে বাক্য বানান-
মুখ ম্লান হওয়া, চক্কর খেয়ে যাওয়া, দুই থেকে চার বানানো, চোখ দিয়ে কথা বলা
4. নিম্নলিখিত শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ দিন-
(ক) শিদ্দত _____________ (ঙ) নাওয়াকেফ _____________
(খ) ইয়ারানা _____________ (চ) ইয়াকীন _____________
(গ) বমুশকিল _____________ (ছ) হাবী _____________
(ঘ) খালিস _____________ (জ) রেশা _____________
5. নিম্নলিখিতের সন্ধিবিচ্ছেদ করুন-
(ক) চিত্রাংকন $\quad$ $-$ $\quad$ _____________ $+$ _____________
(খ) সর্বোত্তম $\quad$ $-$ $\quad$ _____________ $+$ _____________
(গ) চর্মোৎকর্ষ $\quad$ $-$ $\quad$ _____________ $+$ _____________
(ঘ) রূপান্তরণ $\quad$ $-$ $\quad$ _____________ $+$ _____________
(ঙ) ঘনানন্দ $\quad$ $-$ $\quad$ _____________ $+$ _____________
6. নিম্নলিখিতের সমাস বিগ্রহ করুন এবং সমাসের নামও লিখুন-
(ক) কলা-মর্মজ্ঞ __________________
(খ) লোকপ্রিয় __________________
(গ) রাষ্ট্রপতি __________________
যোগ্যতা বিস্তার
1. ফণীশ্বরনাথ রেণুর কোন গল্পের ওপর ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্র ভিত্তি, তথ্য সংগ্রহ করুন এবং মূল রচনা পড়ুন।
2. সংবাদপত্রে চলচ্চিত্রের সমালোচনা দেওয়া হয়। কোনো তিনটি চলচ্চিত্রের সমালোচনা পড়ুন এবং ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্র দেখে এই চলচ্চিত্রের সমালোচনা নিজে লিখার চেষ্টা করুন।
প্রকল্প কাজ
1. চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে আপনি প্রায়শই এটি শুনে থাকবেন- ‘যে কথা আগের চলচ্চিত্রে ছিল, তা এখন কোথায়। বর্তমান যুগের চলচ্চিত্র এবং আগের চলচ্চিত্রের মধ্যে কী মিল ও পার্থক্য আছে? শ্রেণিতে আলোচনা করুন।
2. ‘তেসরি কসম’ এর মতো আরও চলচ্চিত্র আছে যা কোনো না কোনো ভাষার সাহিত্যিক রচনার ওপর বানানো হয়েছে। এমন চলচ্চিত্রের তালিকা নিম্নলিখিত প্রপত্রের ভিত্তিতে তৈরি করুন।
| ক্র.নং | চলচ্চিত্রের নাম | সাহিত্যিক রচনা | ভাষা | রচয়িতা |
|---|---|---|---|---|
| 1. | দেবদাস | দেবদাস | বাংলা | শরৎচন্দ্র |
| 2. | _______ | _______ | _______ | _______ |
| 3. | _______ | _______ | _______ | _______ |
| 4. | _______ | _______ | _______ | _______ |
3. লোকগীত আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। ‘তেসরি কসম’ চলচ্চিত্রে লোকগীতের প্রয়োগ করা হয়েছে। আপনিও আপনার এলাকার প্রচলিত দুই-তিনটি লোকগীত সংগ্রহ করে প্রকল্প কপিতে লিখুন।
শব্দার্থ এবং টিপ্পনী
| অন্তরাল | - এর পরে |
| অভিনীত | - অভিনয় করা হয়েছে |
| সর্বোত্তম | - সবচেয়ে ভালো |
| সেলুলয়েড | - ক্যামেরার রিলে তোলা ছবি পর্দায় উপস্থাপন করা |
| সার্থকতা | - সাফল্যের সঙ্গে |
| শৈল্পিকতা | - শিল্পে পরিপূর্ণ |
| সংবেদনশীলতা | - ভাবপ্রবণতা |
| শিদ্দত | - তীব্রতা |
| অনন্য | - পরম / অত্যন্ত |
| তন্ময়তা | - নিবিষ্টতা |
| পারিশ্রমিক | - মেহনতানা |
| ইয়ারানা মস্তি | - বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গি |
| আগাহ | - সচেতন |
| আত্ম-সন্তুষ্টি | - নিজের তৃপ্তি |
| বমুশকিল | - খুব কষ্টে |
| বিতরণকারী | - প্রচারকারী মানুষ |
| নামজাদা | - বিখ্যাত |
| নাওয়াকেফ | - অজানা |
| ইকরার | - সম্মতি |
| মত | - ইচ্ছা |
| উচ্ছলতা | - ভাসা ভাসা / নিচু |
| অভিজাত্য | - পরিশোধিত |
| ভাব-প্রবণ | - অনুভূতিতে ভরা |
| দুরূহ | - কঠিন |
| উবুড় | - হাঁটু মুড়ে পায়ের তলার ওপর ভর দিয়ে বসা |
| সূক্ষ্মতা | - বাড়িকিয়া |
| স্পন্দিত | - পরিচালনা করা / গতিশীল |
| লালায়িত | - আগ্রহী |
| টপ্পর-গাড়ি | - অর্ধগোলাকার ছাউনি যুক্ত বলদগাড়ি |
| হুজুম | - ভিড় |
| প্রতিরূপ | - ছায়া |
| রূপান্তরণ | - কোনো একটি রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত করা |
| লোক-তত্ত্ব | - লোক সম্পর্কিত |
| ত্রাসদ | - দুঃখদ |
| গ্লোরিফাই | - গুণগান / মহিমামণ্ডিত করা |
| বিকৃত | - ভয়াবহ |
| জীবন-সাপেক্ষ | - জীবনের প্রতি |
| ধন-লিপ্সা | - ধনের অত্যাধিক চাহিদা |
| প্রক্রিয়া | - পদ্ধতি |
| বাঁচে | - পড়া |
| ভাগ | - ভাগ্য |
| ভরমায়ে | - ভ্রম হওয়া / মিথ্যা আশ্বাস |
| সমালোচক | - সমালোচনা করা ব্যক্তি |
| কলা-মর্মজ্ঞ | - কলার পারখ করা ব্যক্তি |
| চর্মোৎকর্ষ | - উচ্চতার শিখরে |
| খালিস | - শুদ্ধ |
| ভুচ্চ | - নিছক / একেবারে |
| কিংবদন্তি | - প্রবাদ |