অধ্যায় ০২ তুলসীদাস

তুলসীদাস

সন্ ১৫৩২-১৬২৩

তুলসীদাসের জন্ম উত্তর প্রদেশের বাঁদা জিলার রাজাপুর জগাঁওয়ে সন্ ১৫৩২ সালে হয়েছিল। কিছু বিদ্বান তাঁর জন্মস্থান সোরোঁ (জিলা-এটা) বলেও মনে করেন। তুলসীর বাল্যকাল খুবই সংঘর্ষপূর্ণ ছিল। জীবনের প্রারম্ভিক বছরগুলিতেই মাতা-পিতার থেকে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। বলা হয় যে গুরুকৃপায় তিনি রামভক্তির পথ পেয়েছিলেন। তিনি মানব-মূল্যের উপাসক কবি ছিলেন। রামভক্তি পরম্পরায় তুলসী অতুলনীয়। রামচরিতমানস কবির একনিষ্ঠ রামভক্তি ও তাঁর সৃজনাত্মক কৌশলের মনোরম উদাহরণ। তাঁর রাম মানবীয় মর্যাদা ও আদর্শের প্রতীক যাদের মাধ্যমে তুলসী নীতি, স্নেহ, শীল, বিনয়, ত্যাগ ইত্যাদি উদাত্ত আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রামচরিতমানস উত্তর ভারতের জনতার মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। মানস ছাড়াও কবিতাবলী, গীতাবলী, দোহাবলী, কৃষ্ণগীতাবলী, বিনয়পত্রিকা ইত্যাদি তাঁর প্রধান রচনা। অযোধ্যা ও ব্রজ উভয় ভাষাতেই তাঁর সমান অধিকার ছিল। সন্ ১৬২৩ সালে কাশীতে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

তুলসী রামচরিতমানসের রচনা অযোধ্যায় এবং বিনয়পত্রিকা ও কবিতাবলীর রচনা ব্রজভাষায় করেছেন। সে সময় প্রচলিত সমস্ত কাব্য রূপগুলিকে তুলসীর রচনায় দেখা যায়। রামচরিতমানসের প্রধান ছন্দ চৌপাই এবং মধ্যে মধ্যে দোহা, সোরঠা, হরিগীতিকা ও অন্যান্য ছন্দ পিরোয়া হয়েছে। বিনয়পত্রিকার রচনা গেয় পদে হয়েছে। কবিতাবলীতে সভয়া ও কবিত্ত ছন্দের ছটা দেখা যায়। তাঁর রচনায় প্রবন্ধ ও মুক্তক উভয় প্রকার কাব্যেরই উৎকৃষ্ট রূপ আছে।


এই অংশ রামচরিতমানসের বাল কাণ্ড থেকে নেওয়া হয়েছে। সীতা স্বয়ংবরে রাম কর্তৃক শিব-ধনু ভঙ্গের পর মুনি পরশুরাম যখন এই সংবাদ পান তখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সেখানে আসেন। শিব-ধনুকে খণ্ডিত দেখে তিনি আপা থেকে বাইরে হয়ে যান। রামের বিনয় ও বিশ্বামিত্রের বোঝানোয় এবং রামের শক্তির পরীক্ষা নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর গোসা শান্ত হয়। এই মধ্যে রাম, লক্ষ্মণ ও পরশুরামের মধ্যে যে সংবাদ হয়েছিল সেই প্রসঙ্গকে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরশুরামের ক্রোধভরা বাক্যের উত্তর লক্ষ্মণ ব্যঙ্গ বচনে দেন। এই প্রসঙ্গের বিশেষত্ব হল লক্ষ্মণের বীর রসে পগি ব্যঙ্গোক্তি এবং ব্যাঞ্জনা শৈলীর সরস অভিব্যক্তি।


রাম-লক্ষ্মণ-পরশুরাম সংবাদ


নাথ সম্ভুধনু ভংজনিহারা। হোইহি কেউ এক দাস তোমারা।।
আয়েসু কাহ কহিঅ কিন মোহী। সুনি রিসাই বোলে মুনি কোহী।।
সেবকু সো জো করৈ সেবকাঈ। অরিকরণী করি করিঅ লরাঈ।।
সুনু রাম জেহি সিবধনু তোরা। সহসবাহু সম সো রিপু মোরা।।
সো বিলগাউ বিহাই সমাজা। ন ত মারৈ জৈহহিঁ সব রাজা।।
সুনি মুনিবচন লখন মুসুকানে। বোলে পরসুধরহি অবমানে।।
বহু ধনুহী তোরী লরিকাঈঁ। কবহুঁ ন অসি রিস কীনহি গোসাঈঁ।।
য়েহি ধনু পর মমতা কেহি হেতূ। সুনি রিসাই কহ ভৃগুকুলকেতূ।।

রে নৃপবালক কালবস বোলত তোহি ন সঁভার।
ধনুহী সম ত্রিপুরারিধনু বিদিত সকল সংসার।।

লখন কহা হসি হমরে জানা। সুনহু দেব সব ধনুষ সমানা।।
কা ছতি লাভু জূন ধনু তোরেঁ। দেখা রাম নয়ন কে ভোরেঁ।।
ছুঅত টূট রঘুপতিহু ন দোসূ। মুনি বিনু কাজ করিঅ কত রোসূ।।
বোলে চিতৈ পরসু কী ওরা। রে সঠ সুনেহি সুভাউ ন মোরা।।
বালকু বোলি বধৌঁ নহি তোহী। কেবল মুনি জড় জানহি মোহী।।
বাল ব্রহ্মচারী অতি কোহী। বিস্ববিদিত ক্ষত্রিয়কুল দ্রোহী।।
ভুজবল ভূমি ভূপ বিনু কীনহী। বিপুল বার মহিদেবনহ্ দীনহী।।
সহসবাহুভুজ ছেদনিহারা। পরসু বিলোকু মহীপকুমারা।।

মাতু পিতহি জনি সোচবস করসি মহীসকিসোর।
গর্ভনহ্ কে অর্ভক দলন পরসু মোর অতি ঘোর।।

বিহসি লখনু বোলে মৃদু বানী। অহো মুনীসু মহাভট মানী।।
পুনি পুনি মোহি দেখাব কুঠারু। চহত উড়াবন ফুঁকি পহারূ।।
ইহাঁ কুম্হড়বতিয়া কেউ নাহীঁ। জে তর্জনী দেখি মরি জাহীঁ।।
দেখি কুঠারু সরাসন বানা। মৈঁ কছু কহা সহিত অভিমানা।।
ভৃগুসুত সমুঝি জনেউ বিলোকী। জো কছু কহহু সহৌঁ রিস রোকী।।
সুর মহিসুর হরিজন অরু গাঈ। হমরে কুল ইন্হ পর ন সুরাঈ।।
বধেঁ পাপু অপরীরতি হারেঁ। মারতহূ পা পরিঅ তোমারেঁ।
কোটি কুলিস সম বচনু তোমারা। ব্যর্থ ধরহু ধনু বান কুঠারা।।

জো বিলোকি অনুচিত কহেউঁ ছমহু মহামুনি ধীর।
সুনি সরোষ ভৃগুবংশমনি বোলে গিরা গম্ভীর।।

প্রশ্ন-অভ্যাস

1. পরশুরামের ক্রোধ করার পর লক্ষ্মণ ধনুষের টুটে যাওয়ার জন্য কোন কোন যুক্তি দিয়েছিলেন?

2. পরশুরামের ক্রোধ করার পর রাম ও লক্ষ্মণের যে প্রতিক্রিয়াগুলি হয়েছিল সেগুলির ভিত্তিতে দুজনের স্বভাবের বিশেষত্বগুলি নিজের কথায় লিখ।

3. লক্ষ্মণ ও পরশুরামের সংবাদের যে অংশটি তোমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে সেটি নিজের কথায় সংবাদ শৈলীতে লিখ।

4. পরশুরাম নিজের বিষয়ে সভায় কী কী বলেছিলেন, নিম্ন পদ্যাংশের ভিত্তিতে লিখ-

বাল ব্রহ্মচারী অতি কোহী। বিস্ববিদিত ক্ষত্রিয়কুল দ্রোহী।।
ভুজবল ভূমি ভূপ বিনু কীনহী। বিপুল বার মহিদেবনহ্ দীনহী।।
সহসবাহুভুজ ছেদনিহারা। পরসু বিলোকু মহীপকুমারা।।

মাতু পিতহি জনি সোচবস করসি মহীসকিসোর।
গর্ভনহ্ কে অর্ভক দলন পরসু মোর অতি ঘোর।।

5. লক্ষ্মণ বীর যোদ্ধার কী কী বিশেষত্ব বলেছিলেন?

6. সাহস ও শক্তির সাথে বিনয় থাকলে ভাল। এই উক্তির উপর নিজের মতামত লিখ।

7. ভাব স্পষ্ট কর-

(ক) বিহসি লখনু বোলে মৃদু বানী। অহো মুনীসু মহাভট মানী।।
পুনি পুনি মোহি দেখাব কুঠারূ। চহত উড়াবন ফুঁকি পহারূ।।

(খ) ইহাঁ কুম্হড়বতিয়া কেউ নাহীঁ। জে তর্জনী দেখি মরি জাহীঁ।।
দেখি কুঠারু সরাসন বানা। মৈঁ কছু কহা সহিত অভিমানা।।

8. পাঠের ভিত্তিতে তুলসীর ভাষা সৌন্দর্যের উপর দশটি লাইন লিখ।

9. এই পুরো প্রসঙ্গে ব্যঙ্গের এক অনন্য সৌন্দর্য আছে। উদাহরণ সহ স্পষ্ট কর।

10. নিম্নলিখিত পংক্তিগুলিতে ব্যবহৃত অলংকার চিনে লিখ-

(ক) বালকু বোলি বধৌঁ নহি তোহী।

(খ) কোটি কুলিস সম বচনু তোমারা।

রচনা ও অভিব্যক্তি

11. “সামাজিক জীবনে ক্রোধের প্রয়োজন সমানভাবে পড়ে। যদি ক্রোধ না থাকে তবে মানুষ অন্যের দ্বারা পৌঁছানো অনেক কষ্টের চির-নিবৃত্তির উপায়ই করতে পারবে না।”

আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল জীর এই উক্তি এই কথার পোষকতা করে যে ক্রোধ সবসময় নেতিবাচক ভাব নিয়ে থাকে না বরং কখনও কখনও ইতিবাচকও হয়। এর পক্ষে বা বিপক্ষে নিজের মত প্রকাশ কর।

12. নিজের কোনো পরিচিত বা বন্ধুর স্বভাবের বিশেষত্বগুলি লিখ।

13. অন্যের ক্ষমতাগুলিকে কম মনে করা উচিত নয়- এই শিরোনামকে মনে রেখে একটি গল্প লিখ।

14. সেই ঘটনাগুলিকে মনে করে লিখ যখন তুমি অন্যায়ের প্রতিকার করেছ।

15. অযোধ্যা ভাষা আজ কোন কোন অঞ্চলে বলা হয়?

পাঠেতর সক্রিয়তা

  • তুলসীর অন্যান্য রচনাগুলি গ্রন্থাগার থেকে নিয়ে পড়।

  • দোহা ও চৌপাইয়ের বাচনের একটি পারম্পরিক ঢং আছে। লয় সহ এগুলির বাচনের অভ্যাস কর।

  • কখনো তোমাকে পারম্পরিক রামলীলা অথবা রামকথার নাট্য উপস্থাপনা দেখার সুযোগ মিলে থাকবে সেই অভিজ্ঞতাটি নিজের কথায় লিখ।

  • এই প্রসঙ্গের নাট্য উপস্থাপনা কর।

  • কোহী, কুলিস, -এই শব্দগুলির বিষয়ে শব্দকোষে দেওয়া বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ কর।

শব্দ-সম্পদ

ভংজনিহারা - ভঙ্গকারী, ভাঙনেওয়ালা
রিসাই - ক্রোধ করা
রিপু - শত্রু
বিলগাউ - আলাদা হওয়া
অবমানে - অপমান করা
লরিকাঈঁ - বাল্যকালে
পরসু - ফরসা, কুঠারের মতো একটি শস্ত্র (এটাই পরশুরামের প্রধান শস্ত্র ছিল)
কোহী - ক্রোধী
মহিদেব - ব্রাহ্মণ
বিলোক - দেখে
অর্ভক - বাচ্চা
মহাভট - মহান যোদ্ধা
মহী - ধরা
কুঠারু - কুঠার
কুম্হড়বতিয়া - খুবই দুর্বল, নিঃশক্ত ব্যক্তি, কাশিফল বা কুমড়োর খুব ছোট ফল
তর্জনী - বুড়ো আঙুলের পাশের আঙুল
কুলিস - কঠোর
সরোষ - ক্রোধ সহ

এও জান

দোহা - দোহা একটি জনপ্রিয় মাত্রিক ছন্দ যার প্রথম ও তৃতীয় পংক্তিতে ১৩-১৩ মাত্রা থাকে এবং দ্বিতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে ১১-১১ মাত্রা।

চৌপাই - মাত্রিক ছন্দ চৌপাই চারটি পংক্তির হয় এবং এর প্রতিটি পংক্তিতে ১৬ মাত্রা থাকে।

তুলসীর আগে সুফি কবিরাও অযোধ্যা ভাষায় দোহা-চৌপাই ছন্দের প্রয়োগ করেছেন যার মধ্যে মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদ্মাবত উল্লেখযোগ্য।

পরশুরাম ও সহস্রবাহুর কাহিনী

পাঠে ‘সহসবাহু সম সো রিপু মোরা’র কয়েকবার উল্লেখ এসেছে। পরশুরাম ও সহস্রবাহুর বৈরীর অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। মহাভারত অনুসারে এই কাহিনী এইরকম-

পরশুরাম ঋষি জমদগ্নির পুত্র ছিলেন। একবার রাজা কার্তবীর্য সহস্রবাহু শিকার খেলতে খেলতে জমদগ্নির আশ্রমে এলেন। জমদগ্নির কাছে কামধেনু গাই ছিল যা বিশেষ গাই ছিল, বলা হয় সে সমস্ত কামনা পূর্ণ করত। কার্তবীর্য সহস্রবাহু ঋষি জমদগ্নির থেকে কামধেনু গাইয়ের দাবি করলেন। ঋষি দ্বারা না করায় সহস্রবাহু কামধেনু গাইয়ের বলপূর্বক অপহরণ করে নিলেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে পরশুরাম সহস্রবাহুর বধ করলেন। এই কাজের ঋষি জমদগ্নি খুব নিন্দা করলেন এবং পরশুরামকে প্রায়শ্চিত করতে বললেন। ওদিকে সহস্রবাহুর পুত্রেরা ক্রোধে এসে ঋষি জমদগ্নির বধ করলেন। এতে পুনঃ ক্রুদ্ধ হয়ে পরশুরাম পৃথিবীকে ক্ষত্রিয় বিহীন করার প্রতিজ্ঞা করলেন।