ভারতের সংবিধান
ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা
১. সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
- প্রস্তাবনা হলো সংবিধানের ভূমিকামূলক অংশ যা ভারতীয় সংবিধানের উদ্দেশ্য ও মূলনীতির রূপরেখা তুলে ধরে।
- এটি কোনো আইনি দলিল নয়, তবে এটি সংবিধানের আত্মার বিবৃতি হিসেবে কাজ করে।
- এটি ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯-এ গৃহীত হয় এবং ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০-এ কার্যকর হয়।
২. প্রস্তাবনার মূল উপাদানসমূহ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| সার্বভৌম | চূড়ান্ত ক্ষমতা নিহিত ভারতের জনগণের হাতে। |
| গণতন্ত্র | সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়। |
| সমাজতান্ত্রিক | রাষ্ট্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করে। |
| ধর্মনিরপেক্ষ | রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে প্রাধান্য দেয় না এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। |
| গণরাজ্য | রাষ্ট্রপ্রধান একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, কোনো রাজা নন। |
| ন্যায়, স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব | এগুলো হলো সংবিধানের মূল মূল্যবোধ। |
৩. প্রস্তাবনায় সংশোধন
- ৪২তম সংশোধন (১৯৭৬) প্রস্তাবনায় “সমাজতান্ত্রিক”, “ধর্মনিরপেক্ষ” ও “অখণ্ডতা” শব্দগুলি যোগ করে।
- ৮৬তম সংশোধন (২০০২) প্রস্তাবনায় “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দটি যোগ করে (ইতিমধ্যে উপস্থিত ছিল, তবে গুরুত্ব দেওয়া হয়)।
সংবিধানের বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. লিখিত সংবিধান
- সংবিধান একটি একক দলিল যাতে ৩৯৫টি অনুচ্ছেদ, ১২টি তফসিল এবং ২৫টি অংশ রয়েছে।
- এটি দেশের মৌলিক আইন এবং সর্বোচ্চ আইনি কর্তৃত্ব।
২. সংসদীয় ব্যবস্থা
- ভারত একটি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অনুসরণ করে।
- রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী সরকারের প্রধান।
- সংসদ গঠিত হয়েছে লোকসভা (জনসভা) এবং রাজ্যসভা (রাজ্য পরিষদ) দ্বারা।
৩. একক বৈশিষ্ট্যসহ ফেডারেল ব্যবস্থা
- ভারত একটি ফেডারেল ইউনিয়ন যেখানে রয়েছে ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
- সংবিধান জরুরি অবস্থায় ফেডারেল কাঠামোর সঙ্গে একক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।
- আর্টিকেল ৩৫৬ রাষ্ট্রপতিকে রাজ্যগুলিতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা দেয়, যাতে সেগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
- আর্টিকেল ৩৫২ জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমতি দেয়, যা পুরো ফেডারেল কাঠামোকে কোনো সংশোধন ছাড়াই একক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করে।
৪. গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো
- সংবিধানে সার্বজনিক প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার চালু করা হয়েছে।
- ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, যা সমস্ত ধর্মের সমান আচরণ নিশ্চিত করে।
- মৌলিক অধিকার সমস্ত নাগরিককে নিশ্চিত করা হয়েছে।
৫. মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য
- সংবিধানের তৃতীয় অংশে মৌলিক অধিকার রয়েছে।
- চতুর্থ অংশ-ক-তে মৌলিক কর্তব্য রয়েছে, যা ৪২তম সংশোধনী (১৯৭৬)-র মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে।
- সংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার হলো সংবিধানের প্রাণ (আর্টিকেল ৩২)।
৬. বিচারিক পর্যালোচনা ও স্বাধীনতা
- সুপ্রিম কোর্ট-এর বিচারিক পর্যালোচনা-র ক্ষমতা রয়েছে আর্টিকেল ১৩-এর অধীনে।
- বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে কোলেজিয়াম পদ্ধতি এবং বিচারপতিদের পদের নিরাপত্তা-র মাধ্যমে।
৭. জরুরি বিধান
- জরুরি ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে আর্টিকেল ৩৫২ (জাতীয় জরুরি), ৩৫৫ (রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা), ৩৬০ (রাজ্য জরুরি)-এর অধীনে।
- এই বিধানগুলো ১৯৭৫ সালে সংশোধন করা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে।
৮. পঞ্চায়েত রাজ ও স্থানীয় শাসন
- ৭৩তম সংশোধনী (১৯৯২) গ্রামীণ অঞ্চলে পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠান চালু করে।
- ৭৪তম সংশোধনী (১৯৯২) শহরাঞ্চলে নগর পালিকা চালু করে।
৯. নির্বাচনী ও বিচারিক সংস্কার
- সার্বজনিক প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার চালু হয়েছিল ১৯৫০ সালে।
- নির্বাচনী সংস্কার-এর মধ্যে রয়েছে ইলেক্টোরাল বন্ড আইন (২০২০) এবং নাগরিকদের নির্বাচনী নিবন্ধন আইন (২০২১)।
- সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক পর্যালোচনা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যা-তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সংবিধানের সময়সূচী ও অংশ
১. সংবিধানের সময়সূচী
| সময়সূচী | বিবরণ |
|---|---|
| ১ম সময়সূচী | রাজ্যসমূহ ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের তালিকা ধারণ করে। |
| ২য় সময়সূচী | রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, ক্যাগ, স্পিকার ইত্যাদির বেতন ও ভাতা ধারণ করে। |
| ৩য় সময়সূচী | বিভিন্ন পদাধিকারীদের শপথ গ্রহণের ফরম ধারণ করে। |
| ৪র্থ সময়সূচী | রাজ্যসভায় আসন বণ্টন ধারণ করে। |
| ৫ম সময়সূচী | সূচিবদ্ধ অঞ্চল ও উপজাতীয় অঞ্চলের প্রশাসনের বিধান ধারণ করে। |
| ৬ষ্ঠ সময়সূচী | আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের প্রশাসনের বিধান ধারণ করে। |
| ৭ম সময়সূচী | কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে আইন প্রণয়ন ক্ষমতার বণ্টন ধারণ করে। |
| ৮ম সময়সূচী | সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ভাষার তালিকা ধারণ করে। |
| ৯ম সময়সূচী | বিচারিক পর্যালোচনার অধীন নয় এমন আইনের তালিকা ধারণ করে। |
| ১০ম সময়সূচী | দলবদলের কারণে সংসদ ও বিধানসভার সদস্যদের অযোগ্যতার বিধান ধারণ করে। |
| ১১তম সময়সূচী | পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৯টি বিষয়ের তালিকা ধারণ করে। |
| ১২তম সময়সূচী | নগর পালিকা (পৌরসভা) জন্য ১৮টি বিষয়ের তালিকা ধারণ করে। |
২. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- উদ্বোধনী হলো সংবিধানের প্রাণ।
- তৃতীয় অংশ হলো সংবিধানের হৃদয়।
- ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনী পঞ্চায়তি রাজ ও নগর পালিকা চালু করেছে।
- ৪২তম সংশোধনী “সমাজতান্ত্রিক”, “ধর্মনিরপেক্ষ” ও “অখণ্ডতা” উদ্বোধনীতে যোগ করেছে।
- ৮৬তম সংশোধনী “ধর্মনিরপেক্ষ” উদ্বোধনীতে যোগ করেছে।
- অনুচ্ছেদ ৩২ হলো সংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার।
- অনুচ্ছেদ ১৩ বিচারিক পর্যালোচনা প্রদান করে।
- অনুচ্ছেদ ৩৫৬ হলো রাষ্ট্রপতির রাজ্য সরকার বরখাস্ত করার ক্ষমতা।
- অনুচ্ছেদ ৩৫২ হলো জাতীয় জরুরি অবস্থা।
- অনুচ্ছেদ ৩৬০ হলো রাজ্য জরুরি অবস্থা।
- অনুচ্ছেদ ৩০১ হলো বাণিজ্য ও বাণিজ্যের স্বাধীনতার অধিকার।
- অনুচ্ছেদ ৩০৪ হলো রাজ্যগুলির সাপেক্ষে বাণিজ্য ও বাণিজ্যের স্বাধীনতার অধিকার।
- অনুচ্ছেদ ৩০৫ হলো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির সাপেক্ষে বাণিজ্য ও বাণিজ্যের স্বাধীনতার অধিকার।