বাংলার গভর্নর-জেনারেলরা
বাংলার গভর্নর-জেনারেল
১. গভর্নর-জেনারেল এবং তাঁদের কাজ
১.১ ভূমিকার সারসংক্ষেপ
- বাংলার গভর্নর-জেনারেল ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রারম্ভিক ঔপনিবেশিক যুগে সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ।
- ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩-এর অধীনে এই পদ সৃষ্টি হয়।
- গভর্নর-জেনারেলের দায়িত্ব ছিল:
- বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকৃত অঞ্চল শাসন করা।
- রাজস্ব, সামরিক ও কূটনৈতিক বিষয় পরিচালনা করা।
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করা এবং ভারতে এর নীতি বাস্তবায়ন করা।
- পরবর্তীতে এই পুরো ব্রিটিশ ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
- লক্ষ্য করুন: ১৮৫৮ সালে সরাসরি ব্রিটিশ মুকুটের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত গভর্নর-জেনারেল কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করতেন, ব্রিটিশ মুকুটের নয়।
১.২ প্রধান গভর্নর-জেনারেল এবং তাঁদের অবদান
| গভর্নর-জেনারেলের নাম | মেয়াদ | প্রধান অবদান | গুরুত্বপূর্ণ তারিখ | নোট |
|---|---|---|---|---|
| ওয়ারেন হেস্টিংস | ১৭৭৩–১৭৮৫ | বাংলায় দিওয়ানি (রাজস্ব) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, স্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। | ১৭৭৩–১৭৮৫ | প্রায়শই ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল হিসেবে বিবেচিত। |
| লর্ড কর্নওয়ালিস | ১৭৮৬–১৭৯৩ | কর্নওয়ালিস কোড প্রবর্তন করেন, রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার করেন এবং বাংলার সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। | ১৭৮৬–১৭৯৩ | প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনি আধুনিকীকরণের জন্য পরিচিত। |
| লর্ড ওয়েলেসলি | ১৭৯৮–১৮০৫ | প্যারামিলিটারি অভিযানের মাধ্যমে ব্রিটিশ অঞ্চল সম্প্রসারণ করেন, সহায়ক মিত্রতা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেন এবং ল্যাপস নীতি প্রচার করেন। | ১৭৯৮–১৮০৫ | ভারতে ব্রিটিশ ক্ষমতা সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। |
| লর্ড হেস্টিংস | ১৮১৩–১৮২৩ | আক্রমণাত্মক নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশ সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখেন, তৃতীয় অঙ্গল-মারাঠা যুদ্ধ (১৮১৭-১৮১৮) করেন এবং পিন্ডারিদের পরাজিত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য সুদৃঢ় করেন। | ১৮১৩–১৮২৩ | সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ ক্ষমতা সম্প্রসারণ ও সুদৃঢ়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। |
| লর্ড অকল্যান্ড | ১৮৩৪–১৮৪২ | অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে মনোনিবেশ করেন, সামাজিক সংস্কার প্রচার করেন এবং অ্যাঙ্গলো-আফগান যুদ্ধ সমর্থন করেন। | ১৮৩৪–১৮৪২ | প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্যোগের জন্য পরিচিত। |
| লর্ড এলেনবরো | ১৮৪২–১৮৪৪ | পাঞ্জাব অস্থিরতা এবং সতলজ প্রস্তাবের কারণে পদত্যাগ করেন। | ১৮৪২–১৮৪৪ | তাঁর মেয়াদ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরা ছিল। |
| লর্ড ডালহৌসি | ১৮৪৮–১৮৫৬ | ল্যাপস নীতি, রেলওয়ে নীতি এবং শিক্ষা নীতির জন্য পরিচিত। | ১৮৪৮–১৮৫৬ | ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী গভর্নর-জেনারেল। |
| লর্ড ক্যানিং | ১৮৫৬–১৮৬২ | সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭)-এর পর পদত্যাগ করেন এবং ১৮৫৮ সালের ভারত সরকার আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে হস্তান্তর করে। | ১৮৫৬–১৮৬২ | ব্রিটিশ ক্রাউন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের আগে বাংলার শেষ গভর্নর-জেনারেল। |
১.৩ গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সংস্কার
- স্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): কর্নওয়ালিসের প্রবর্তন, এটি চিরস্থায়ীভাবে ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ করে জমিদারদের উত্থান ঘটায়।
- কর্নওয়ালিস কোড (১৭৯৩): রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার করে, বৃত্তাকার ও রাজস্ব বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে এবং দিওয়ানি ও নিজামত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
- অনুবন্ধী মিত্রতা ব্যবস্থা (১৮০১): ওয়েলেসলির প্রবর্তন, এটি ব্রিটিশদের সরাসরি দখল ছাড়াই ভারতীয় রাজ্যগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়।
- ল্যাপস নীতি (১৮৪৮): ডালহৌসির বাস্তবায়ন, এটি পুরুষ উত্তরাধিকারী ছাড়া রাজ্যগুলি দখল করার অনুমতি দেয়।
- রেলওয়ে নীতি (১৮৫৩): বাণিজ্য ও সামরিক চলাচল সহজ করতে রেলওয়ে নির্মাণে উৎসাহ প্রদান।
- শিক্ষা নীতি (১৮৫৪): ইংরেজি শিক্ষা ও প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রচার।
১.৪ গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও পদ
- ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট: বাংলার গভর্নর-জেনারেলের পদ প্রতিষ্ঠা করে।
- দিওয়ানি: রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা।
- নিজামত: বিচার ও সামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা।
- অনুবন্ধী মিত্রতা: ব্রিটিশ ও ভারতীয় রাজ্যগুলির মধ্যে একটি রাজনৈতিক চুক্তি।
- ল্যাপস নীতি: পুরুষ উত্তরাধিকারী ছাড়া রাজ্য দখলের নীতি।
- সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭): ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায় এবং ক্ষমতা ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে হস্তান্তর করে।
১.৫ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (এসএসসি, আরআরবি)
-
বাংলার প্রথম গভর্নর-জেনারেল কে ছিলেন?
→ ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩–১৭৮৫) -
কোন গভর্নর-জেনারেল স্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন?
→ লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৯৩) -
ল্যাপস নীতি (Doctrine of Lapse) কে চালু করেন?
→ লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮) -
সিপাহী বিদ্রোহের পর কোন গভর্নর-জেনারেল পদত্যাগ করেন?
→ লর্ড ক্যানিং (১৮৫৬–১৮৬২) -
সহায়ক মিত্রতা ব্যবস্থার (Subsidiary Alliance System) প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
→ ভারতীয় রাজ্যগুলোর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তার করা। -
রেলওয়ে নীতির জন্য কোন গভর্নর-জেনারেল পরিচিত?
→ লর্ড ডালহৌসি (১৮৫৩) -
ভারত সরকার আইন ১৮৫৮ কবে পাস হয়?
→ ১৮৫৮ (সিপাহী বিদ্রোহের পর) -
বাংলার গভর্নর-জেনারেলের ভূমিকা কী ছিল?
→ বাংলা শাসন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ভারতে ব্রিটিশ মুকুটের প্রতিনিধিত্ব করা।
১.৬ গভর্নর-জেনারেলদের মধ্যে পার্থক্য
| দিক | ওয়ারেন হেস্টিংস | লর্ড কর্নওয়ালিস | লর্ড ওয়েলেসলি | লর্ড ডালহৌসি |
|---|---|---|---|---|
| মূল নীতি | দিওয়ানি ব্যবস্থা, স্থায়ী বন্দোবস্ত | কর্নওয়ালিস কোড, রাজস্ব সংস্কার | সহায়ক মিত্রতা, ল্যাপস নীতি | ল্যাপস নীতি, রেলওয়ে নীতি |
| সম্প্রসারণ | সীমিত | মাঝারি | আক্রমণাত্মক | আক্রমণাত্মক |
| আইনি সংস্কার | সূচনা করেন | সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন | সীমিত | সীমিত |
| সামাজিক সংস্কার | সীমিত | মাঝারি | সীমিত | মাঝারি |
| উত্তরাধিকার | ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি | প্রশাসনিক সংস্কার | ব্রিটিশ ক্ষমতার সম্প্রসারণ | আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ |
১.৭ মূল বিন্দুসমূহের সারসংক্ষেপ
- বাংলার গভর্নর-জেনারেল ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ।
- এই পদটি ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর অধীনে সৃষ্টি হয়।
- প্রধান সংস্কারগুলির মধ্যে রয়েছে স্থায়ী বন্দোবস্ত, কর্ণওয়ালিস কোড, সহায়ক মিত্রতা, এবং লেপস ডকট্রিন।
- সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায়।
- ভারত সরকার আইন ১৮৫৮ ক্ষমতা ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে হস্তান্তর করে।