দিল্লি সালতানাত
দিল্লি সুলতানাত
১. দিল্লি সুলতানাতের প্রতিষ্ঠা
- প্রতিষ্ঠাতা: কুতুব-উদ-দিন ঐবক (১২০৬)
- গৌড়ি সুলতান মুইজ-উদ-দিন মুহম্মদ গৌড়ির মৃত্যুর পর ১২০৬ সালে ঐবক মামলুক (দাস) রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
- রাজধানী: দিল্লি
- প্রধান ঘটনা:
- ঐবক ১২০৬ সালে দিল্লির শেষ রাজপুত শাসক রাজা যোগীন্দ্রকে পরাজিত করেন।
- তিনি ১২২০ সালে কুতুব মিনার-এর ভিত্তি স্থাপন করেন।
- ইলতুতমিশ (শাসন ১২১১–১২৩৬) সুলতানাতকে সুদৃঢ় করেন এবং দিল্লি সুলতানাতকে উত্তর ভারতের একটি প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
২. ইলবারি/মামলুক/দাস রাজবংশ
শাসকগণ:
- কুতুব-উদ-দিন ঐবক (১২০৬–১২১০)
- ইলতুতমিশ (১২১১–১২৩৬)
- রাজিয়া সুলতানা (১২৩৬–১২৪০)
- গিয়াসউদ্দিন বলবন (১২৬৬–১২৮৭)
অবদান:
- ইলতুতমিশ:
- দিল্লি সুলতানাতকে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
- ইকতা প্রথা এবং দিওয়ান-ই-আরিজ চালু করেন।
- তুর্কি সংস্কৃতি ও প্রশাসন-কে উৎসাহিত করেন।
- রাজিয়া সুলতানা:
- সুলতানাতের প্রথম ও একমাত্র নারী শাসকা ছিলেন।
- সৈন্যদের মধ্যে সমতা এবং সব শ্রেণির প্রতি ন্যায্য আচরণ-কে উৎসাহিত করেন।
- বলবন:
- ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে সম্পূর্ণ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
- জিজিয়া কর এবং বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ নীতি চালু করেন।
- সামরিক শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-র প্রতি গুরুত্ব দেন।
নীতিমালা:
- ইকতা পদ্ধতি: সামরিক সেবার বিনিময়ে সৈনিকদের জমি প্রদান।
- দিওয়ান-ই-আরিজ: সামরিক বিভাগ।
- জিজিয়া কর: অমুসলিমদের উপর কর।
- বলবনের অধীনে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।
৩. খিলজি বংশ
শাসকগণ:
- জালালউদ্দিন খিলজি (১২৯০–১২৯৬)
- আলাউদ্দিন খিলজি (১২৯৬–১৩১৪)
অবদান:
- আলাউদ্দিন খিলজি:
- সুলতানাতকে গুজরাট, বাংলা ও দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন।
- বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেন।
- দৌলতাবাদ-এর মতো দুর্গনগরী প্রতিষ্ঠা করেন।
নীতিমালা:
- বাজার সংস্কার: নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ।
- ভূমি রাজস্ব সংস্কার: জাবতি পদ্ধতি চালু।
- সামরিক সংস্কার: শক্তিশালী সেনা ও নৌবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ।
- কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ও আধিকারিকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
৪. তুগলক বংশ
শাসকগণ:
- গিয়াসউদ্দিন তুগলক (১৩২০–১৩২৫)
- মুহাম্মদ বিন তুগলক (১৩২৫–১৩৫১)
- ফিরোজ শাহ তুগলক (১৩৫১–১৩৮৮)
অবদান:
- ফিরোজ শাহ তুগলক:
- “ন্যায়পরায়ণ ফিরোজ শাহ” নামে পরিচিত।
- ফিরোজাবাদ, তুগলকাবাদ এবং হাউজ খাস নির্মাণ করেন।
- সেচ প্রকল্প এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করেন।
- ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা এবং কর নীতি সংস্কার করেন।
- মুহাম্মদ বিন তুগলক:
- রাজধানী দৌলতাবাদে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন (১৩২৭)।
- টোকেন মুদ্রা এবং মুদ্রা সংস্কার চালু করেন।
- সাম্রাজ্যকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।
- গিয়াসউদ্দিন তুগলক:
- সাম্রাজ্য সংহত করেন এবং দিওয়ানি ব্যবস্থা শুরু করেন।
নীতিমালা:
- ভূমি রাজস্ব সংস্কার: জবতি পদ্ধতি চালু করেন।
- মুদ্রা সংস্কার: টোকেন মুদ্রা চালু করেন।
- কেন্দ্রীভূত প্রশাসন এবং আধিকারিকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
- দক্ষিণ ভারত ও দক্কনে সামরিক অভিযান।
৫. সৈয়দ বংশ
শাসক:
- খিজর খান (১৪১৪–১৪২১)
- সুলতান মুহাম্মদ শাহ (১৪২১–১৪৪৫)
- সুলতান ইব্রাহিম শাহ (১৪৪৫–১৪৫১)
অবদান:
- খিজর খান:
- সৈয়দ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
- অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতায় মনোনিবেশ করেন।
- সুলতান মুহাম্মদ শাহ:
- ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নীতি অব্যাহত রাখেন।
- দিল্লিতে ক্ষমতা সংহত করতে মনোনিবেশ করেন।
নীতিমালা:
- ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং ইসলামি আইনের কঠোর অনুসরণ।
- কেন্দ্রীভূত প্রশাসন এবং আধিকারিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
- অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সীমিত সামরিক অভিযান।
৬. লোদি বংশ
শাসকগণ:
- বাহলোল লোধি (১৪৫১–১৪৮৯)
- সিকান্দার লোধি (১৪৮৯–১৫১৭)
- ইব্রাহিম লোধি (১৫১৭–১৫২৬)
অবদান:
- বাহলোল লোধি:
- লোধি বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
- সৈয়দ বংশের পতনের পর দিল্লি সুলতানাতকে শক্তিশালী করেন।
- সিকান্দার লোধি:
- সামরিক অভিযান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য পরিচিত।
- আগ্রা নগর প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজধানী দিল্লি থেকে সরিয়ে নেন।
- কৃষি এবং বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেন।
- ইব্রাহিম লোধি:
- লোধি বংশ এবং দিল্লি সুলতানাতের শেষ শাসক।
- ১৫২৬ সালের প্রথম পানিপথের যুদ্ধে বাবরের কাছে পরাজিত হন।
নীতিমালা:
- সামরিক সম্প্রসারণ এবং ক্ষমতার সঙ্কোচন।
- কেন্দ্রীভূত প্রশাসন এবং রাজস্ব সংস্কার।
- সিকান্দার লোধির অধীনে বাণিজ্য ও কৃষির প্রচার।
৭. দিল্লি সুলতানাতের অর্থনীতি
| দিক | বিবরণ |
|---|---|
| কৃষি | রাজস্বের প্রধান উৎস; ভূমি রাজস্ব ছিল প্রধান আয়। |
| বাণিজ্য | মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে বিস্তৃত বাণিজ্য। |
| মুদ্রা | মুহাম্মদ বিন তুগলকের অধীনে টোকেন মুদ্রা চালু হয়। |
| কর আদায় | জিজিয়া কর, ভূমি রাজস্ব, এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ। |
| বাজার সংস্কার | আলাউদ্দিন খিলজির অধীনে মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ। |
| অবকাঠামো | রাস্তা, খাল এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। |
৮. দিল্লি সুলতানাতের অধীনে সমাজ
| গোষ্ঠী | বিবরণ |
|---|---|
| মুসলমানরা | প্রধান শাসক শ্রেণি; প্রশাসন ও সামরিকে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। |
| অমুসলিমরা | জিজিয়া কর-এর অধীনে ছিল; কেউ কেউ ধর্মান্তরিত বা সমন্বিত হয়। |
| রাজপুতরা | প্রথমে প্রতিরোধ করলেও পরে প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত হয়। |
| দাসরা | সৈনিক ও প্রশাসক হিসেবে ব্যবহৃত হত; মামলুক শ্রেণি গঠন করত। |
| কারিগর ও বণিকরা | বাণিজ্য ও নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। |
৯. দিল্লি সালতানাতের রাজনৈতিক কাঠামো
| স্তর | বিবরণ |
|---|---|
| সুলতান | নিরঙ্কুশ শাসক; রাষ্ট্র ও সামরিক প্রধান। |
| উজির (ওজির) | প্রধানমন্ত্রী; দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করত। |
| দিওয়ান-ই-ওজারাত | রাজস্ব বিভাগ। |
| দিওয়ান-ই-আরিজ | সামরিক বিভাগ। |
| দিওয়ান-ই-রিসালাত | ধর্মীয় বিষয় ও বৈদেশিক সম্পর্ক। |
| দিওয়ান-ই-খায়রাত | দান ও কল্যাণ বিভাগ। |
১০. প্রশাসনিক বিভাগ ও তাদের প্রধান
| বিভাগ | প্রধান | কার্য |
|---|---|---|
| দিওয়ান-ই-ওজারাত | ওজির | রাজস্ব ও অর্থ পরিচালনা করত। |
| দিওয়ান-ই-আরিজ | আমির-ই-আরিজ | সামরিক ও প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ করত। |
| দিওয়ান-ই-রিসালাত | আমির-ই-রিসালাত | বৈদেশিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় বিষয় সামলাত। |
| দিওয়ান-ই-খায়রাত | আমির-ই-খায়রাত | কল্যাণ ও দান পরিচালনা করত। |
| দিওয়ান-ই-ইত্তিসাল | আমির-ই-ইত্তিসাল | যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তথ্য পরিচালনা করত। |
১১. দিল্লি সালতানাতের গ্রন্থ ও লেখক
| বই | লেখক | নোট |
|---|---|---|
| তুগলকনামা | আমির খুসরাও | তুগলক বংশের শাসনকাল নিয়ে কবিতা। |
| খাজায়েন-উল-ফুতুহ | জিয়াউদ্দিন বারনি | দিল্লি সুলতানাতের ঐতিহাসিক বিবরণ। |
| তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী | মিনহাজ-উস-সিরাজ | ফিরোজ শাহ তুগলকের বর্ণনা। |
| সিরাজ-উল-তাওয়ারিখ | জিয়াউদ্দিন বারনি | সুলতানাতের বিস্তারিত ইতিহাস। |
| রওজাত-উল-ইফা | আমির খুসরাও | সুলতানাতের কাব্যিক বিবরণ। |
১২. দিল্লি সুলতানাতের পতন
কারণ:
- অন্তর্কলহ: উত্তরাধিকার বিরোধ ও দুর্বল শাসক।
- সামরিক দুর্বলতা: সামরিক শক্তি ও শৃঙ্খলার অবনতি।
- অর্থনৈতিক চাপ: অতিরিক্ত কর ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা।
- বাহ্যিক হুমকি: তৈমুর (১৩৯৮) ও বাবর (১৫২৬) আক্রমণ।
- প্রশাসনিক দুর্নীতি: আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ও দুর্নীতি।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা:
- তৈমুরের আক্রমণ (১৩৯৮): দিল্লি ধ্বংস করে সুলতানাত দুর্বল করে।
- বাবরের আক্রমণ (১৫২৬): মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে দিল্লি সুলতানাতের অবসান ঘটায়।
উত্তরাধিকার:
- সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য অবদান: ইসলামি স্থাপত্য ও ফারসি সংস্কৃতিতে প্রভাব।
- প্রশাসনিক ব্যবস্থা: পরবর্তী মুঘল প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন।
- সামাজিক সমন্বয়: রাজপুত ও অন্যান্য গোষ্ঠী শাসক শ্রেণিতে সমন্বয়।