ভারতে কৃষি
ভারতে কৃষি
১. ঐতিহাসিক দিক
১.১ প্রাচীন যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ – ৫০০ খ্রিস্টাব্দ)
- সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ – ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ): গম, যব, বাজরা এবং তুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক কৃষি।
- বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ – ৫০০ খ্রিস্টাব্দ): গঙ্গা অববাহিকায় ধান চাষের প্রবর্তন।
- মৌর্য সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ – ১৮৫ খ্রিস্টাব্দ): কৃষিজ উদ্বৃত্ত শহরায়ন ও সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছিল।
- অশোকের যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী): সেচ এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ।
১.২ মধ্যযুগ (৫০০ খ্রিস্টাব্দ – ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ)
- নতুন ফসলের প্রবর্তন: চীন থেকে আসা চম্পা ধান, আখ এবং তুলো।
- ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা: মারাঠাদের অধীনে চৌথ এবং সরদেশমুখী-র মতো ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।
- মুঘল যুগ (১৫২৬ – ১৭০৭): সেচ ব্যবস্থা এবং খাল-এর উন্নয়ন; ফসল চক্র-এর প্রবর্তন।
১.৩ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কাল (১৭৫৭ – ১৯৪৭)
- ভূমি রাজস্ব নীতি:
- স্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): জমিদারদের কাছ থেকে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়, কৃষির অবহেলার দিকে পরিচালিত করে।
- রায়তওয়ারি ব্যবস্থা: কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায়।
- মহালওয়ারি ব্যবস্থা: গ্রাম সমাজ থেকে রাজস্ব আদায়।
- কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ: নিল, চা এবং পাটের মতো নগদ ফসলের দিকে ভরসা থেকে রূপান্তর।
- ব্রিটিশ কৃষি বিপ্লব: আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, বীজ এবং যন্ত্রপাতির প্রবর্তন।
- উপনিবেশিক নীতির প্রভাব: ভূমি খণ্ডন, মাটির অবক্ষয়, এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে পরিচালিত করে।
২. বর্তমান পর্যায়
২.১ প্রধান ফসল
| ফসল | প্রধান উৎপাদনকারী রাজ্য | আয়তন (লক্ষ হেক্টরে) | উৎপাদন (মিলিয়ন টনে) |
|---|---|---|---|
| ধান | পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ | ৪৫.৫ | ১৩০ |
| গম | পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ | ৩০.৫ | ১১০ |
| আখ | উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র | ১২.৫ | ৩৮ |
| তুলা | গুজরাট, মহারাষ্ট্র | ১০.৫ | ৪০ |
| ডাল | মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান | ১৫.৫ | ২৫ |
২.২ কৃষি কাঠামো
- ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক: মোট হোল্ডিংয়ের ৮৬% অংশ গঠন করে।
- ভূমি খণ্ডন: গড়ে জমির হোল্ডিং আকার ২ হেক্টরের কম।
- প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রিসিশন ফার্মিং, জিপিএস-ভিত্তিক সরঞ্জাম, এবং ড্রোন সীমিতভাবে গৃহীত হয়।
- সেচ: মাত্র ৪৫% চাষযোগ্য জমি সেচের আওতায়।
- জলসংকট: পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও গুজরাটে ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার।
২.৩ চ্যালেঞ্জ
- জলবায়ু পরিবর্তন: অনিশ্চিত বর্ষা, খরা ও বন্যা।
- মাটির ক্ষয়: রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে উর্বরতা হ্রাস।
- বাজার প্রবেশগম্যতা: দুর্বল অবকাঠামো ও কোল্ড স্টোরেজের অভাব।
- শ্রমঘাটতি: গ্রামীণ কর্মীদের শহরমুখী অভিবাসন।
- ইনপুট খরচ: বীজ, সার ও যন্ত্রপাতির উচ্চ মূল্য।
৩. নীতিমালা
৩.১ স্বাধীনতা-পূর্ব নীতিমালা
- ব্রিটিশ ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা: পূর্বে আলোচিত হয়েছে।
- উপনিবেশিক কৃষি নীতিমালা: রপ্তানিযোগ্য ফসল ও বাণিজ্যিকীকরণের দিকে মনোনিবেশ।
৩.২ স্বাধীনতা-উত্তর নীতিমালা
৩.২.১ ভূমি সংস্কার
- ভূমি সিলিং আইন (১৯৫০-এর দশক): ভূমির কেন্দ্রীভূতকরণ রোধে জমির হোল্ডিং সীমিত করা।
- বাস্তবায়ন সংস্কার: জমিদারি ব্যবস্থা ও বর্গাচাষ বিলোপ।
- ভূমি পুনর্বিতরণ: কৃষকদের মধ্যে ভূমির মালিকানা উন্নত করার লক্ষ্য।
৩.২.২ সবুজ বিপ্লব (১৯৬০-এর দশক – ১৯৭০-এর দশক)
- প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- গম ও চালের উচ্চফলনশীল জাত (HYVs)-এর প্রবর্তন।
- রাসায়নিক সার ও কীটনাশক-এর ব্যবহার।
- খাল ও নলকূপের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ।
- প্রভাব:
- খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
- আঞ্চলিক বৈষম্য: পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি উপকৃত হয়।
- পরিবেশগত সমস্যা: মাটির অবক্ষয়, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা।
৩.২.৩ আধুনিক কৃষি নীতি
৩.২.৩.১ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মিশন (NFSM)
- উদ্দেশ্য: চাল, গম ও ডাল-এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
- ফোকাস: মাটির স্বাস্থ্য, জৈব চাষ ও ফসল বৈচিত্র্যায়ন।
৩.২.৩.২ প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN)
- চালু হয় ২০১৮ সালে।
- উপকারভোগী: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক।
- অর্থের পরিমাণ: প্রতি কৃষককে বছরে ৬,০০০ টাকা, তিন কিস্তিতে।
- উদ্দেশ্য: আর্থিক সহায়তা প্রদান ও ইনপুট খরচ কমানো।
৩.২.৩.৩ পরম্পরাগত কৃষি উন্নয়ন যোজনা (PKVY)
- চালু হয় ২০১৫ সালে।
- উদ্দেশ্য: জৈব চাষ ও প্রমাণিত জৈব পণ্য-র প্রচার।
- ফোকাস: প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও বাজার সংযোগ।
৩.২.৩.৪ টেকসই কৃষির জন্য জাতীয় মিশন (NMSA)
- চালু হয় ২০১৯ সালে।
- ফোকাস: জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, টেকসই সম্পদ ব্যবহার ও প্রযুক্তি গ্রহণ।
- প্রধান উপাদান: মাটির স্বাস্থ্য কার্ড, জল সংরক্ষণ ও ফসল বীমা।
৩.২.৩.৫ ই-ন্যাম (জাতীয় কৃষি বাজার)
- ২০১৬ সালে চালু হয়।
- উদ্দেশ্য: কৃষিপণ্যের জন্য একটি জাতীয় বাজার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
- বৈশিষ্ট্য: অনলাইন লেনদেন, মূল্য নির্ধারণ এবং স্বচ্ছতা।
- প্রভাব: দালাল কমেছে, বাজারে প্রবেশাধিকার বেড়েছে এবং কৃষকদের ভালো দাম পেয়েছে।
৩.৩ গুরুত্বপূর্ণ আইন ও প্রকল্প
| আইন/প্রকল্প | বছর | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| ভূমি সিলিং আইন | ১৯৫০-এর দশক | জমির মালিকানা সীমিত করা |
| জমিদারি বিলোপ আইন | ১৯৫০-এর দশক | জমিদারি প্রথা বাতিল করা |
| জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন | ২০১৩ | খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা |
| প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি | ২০১৮ | কৃষকদের আর্থিক সহায়তা |
| পরম্পরাগত কৃষি বিকাশ যোজনা | ২০১৫ | জৈব চাষ প্রচার করা |
| ই-ন্যাম | ২০১৬ | জাতীয় কৃষি বাজার তৈরি করা |
৩.৪ গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সংজ্ঞা
- সবুজ বিপ্লব: ১৯৬০-১৯৭০ দশকে কৃষিপণ্যত্বের দ্রুত বৃদ্ধির একটি সময়কাল।
- ভূমি সিলিং: একজন ব্যক্তির মালিকানা করতে পারা জমির আইনসিদ্ধ সীমা।
- বাস্তবায়ন সংস্কার: ভাড়াটে কৃষকদের অধিকার ও অবস্থার উন্নতির জন্য ব্যবস্থা।
- উচ্চ ফলনশীল জাত (HYVs): বীজ যা বেশি ফলন দেয় তবে বেশি পানি ও সার প্রয়োজন।
- মাটির স্বাস্থ্য কার্ড: মাটির পুষ্টি উপাদান ও সারের সুপারিশ সম্বলিত একটি নথি।
- ই-ন্যাম: কৃষিপণ্যের অনলাইন লেনদেনের জন্য ইলেকট্রনিক জাতীয় কৃষি বাজার।
৩.৫ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (SSC, RRB)
- সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতার সময় প্রধান ফসল কী ছিল?
- গম, যব, বাজরা এবং তুলা।
- কোন ব্রিটিশ নীতির ফলে জমি জমিদারদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়?
- স্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)।
- ভারতের কোন রাজ্য সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন করে?
- পশ্চিমবঙ্গ।
- প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধির উদ্দেশ্য কী?
- ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান।
- জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
- চাল, গম এবং ডালের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
- কোন আইন জমিদারি প্রথা বিলোপ করে?
- জমিদারি বিলোপ আইন (১৯৫০-এর দশক)।
- আধুনিক ভারতীয় কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
- জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির অবক্ষয় এবং পানির অভাব।
- ভারতে জৈব চাষ উৎসাহিত করে কোন প্রকল্প?
- পরম্পরাগত কৃষি উন্নয়ন যোজনা (PKVY)।