ব্রিটিশ সম্প্রসারণ নীতি
ব্রিটিশ সম্প্রসারণবাদী নীতিসমূহ
বাংলায় বাণিজ্যিক অধিকার
প্রেক্ষাপট ও পটভূমি
- ব্রিটিশ-পূর্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি: মুঘল শাসনের অধীনে বাংলা ছিল একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যা তার সমৃদ্ধ সম্পদ ও উদীয়মান বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল।
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রহ: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় পা রাখতে চেয়েছিল এর ধনসম্পদ কাজে লাগাতে এবং বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করতে।
- গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা: পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা চিহ্নিত করে।
মূল নীতি ও ব্যবস্থাসমূহ
১. ল্যাপস ডকট্রিন
- সংজ্ঞা: ১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসি কর্তৃক প্রবর্তিত একটি নীতি, যা ব্রিটিশদের ভারতীয় রাজ্যসমূহ দখল করার অনুমতি দিত যদি কোনো প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারী না থাকত।
- বাংলায় প্রয়োগ: বাংলায় সরাসরি প্রযোজ্য ছিল না, তবে অন্যান্য অঞ্চল যেমন সাতারা, ঝাঁসি ও নাগপুরে ব্যবহৃত হয়।
- প্রভাব: অনেক রাজ্য দখলের ফলে উপমহাদেশজুড়ে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়।
২. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)
- প্রবর্তন করেন: লর্ড কর্নওয়ালিস
- উদ্দেশ্য: ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করা।
- মূল বৈশিষ্ট্য:
- জমি জমিদারদের মালিক হিসেবে হস্তান্তর করা হয়।
- জমিদারদের কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে কোম্পানিকে দিতে হতো।
- রাজস্ব চিরতরে নির্ধারিত ছিল।
- প্রভাব:
- জমিদাররা ভূমির মালিক হয়ে কৃষকদের শোষণ করে।
- কৃষিতে বিনিয়োগের অভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়।
- কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধি পায়।
৩. রাজস্ব নীতিসমূহ
- ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা: ব্রিটিশরা বাংলা থেকে রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে।
- প্রধান পদ্ধতিসমূহ:
- স্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): উপরে বর্ণিত হিসেবে, লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চালু করেন।
- রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত: মাদ্রাজ ও বোম্বেতে প্রয়োগ করা হয়, যেখানে রাজস্ব সরাসরি কৃষকদের (রায়ত) কাছ থেকে আদায় করা হতো।
- মহলওয়ারি ব্যবস্থা: উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও পাঞ্জাবে প্রবর্তিত, যেখানে গ্রাম সমাজ (মহল) থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো।
- রাজস্ব খাজনা: এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কোম্পানি ভূমি রাজস্ব আদায়ের অধিকার ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের কাছে ইজারা দিত।
- অর্থনীতির ওপর প্রভাব:
- কৃষকরা উচ্চ কর ও ঋণের মুখোমুখি হয়।
- কৃষিপণ উৎপাদন হ্রাস পায়।
- দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়।
৪. বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ
- বাণিজ্যে একচেটিয়া: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়।
- প্রধান বন্দরসমূহ: কোম্পানি কলকাতা, হুগলি এবং পরে বোম্বে ও মাদ্রাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নিয়ন্ত্রণ করে।
- প্রভাব:
- স্থানীয় বাণিজ্য ও হস্তশিল্প শিল্প দমন করা হয়।
- ব্রিটিশ পণ্যের ওপন অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়।
- স্থানীয় শিল্প ও সম্পদের অবক্ষয় ঘটে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও পদসমূহ
| পদ | সংজ্ঞা | বছর |
|---|---|---|
| প্লাসির যুদ্ধ | নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ বিজয় | ১৭৫৭ |
| স্থায়ী বন্দোবস্ত | লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা | ১৭৯৩ |
| ল্যাপস নীতি | উত্তরাধিকারহীন রাজ্যসমূহের অন্তর্ভুক্তির অনুমতিপ্রদানকারী নীতি | ১৮৪৮ |
| জমিদার | কোম্পানির পক্ষে রাজস্ব আদায়কারী স্থানীয় ভূমির মালিক | ১৮–১৯ শতক |
| রাজস্ব চাষ | রাজস্ব আদায় ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের কাছে ইজারা দেওয়া ব্যবস্থা | ১৮ শতক |
| মারে সিস্টেম | ১৮২২ সালে প্রবর্তিত নমনীয় রাজস্ব ব্যবস্থা | ১৮২২ |
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (এসএসসি, আরআরবি)
- প্লাসির যুদ্ধ (১৭৫৭) বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা চিহ্নিত করে।
- স্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) ভূমি রাজস্ব নির্ধারণের জন্য লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করেন।
- ল্যাপস নীতি ঝাঁসি ও নাগপুরের মতো রাজ্যসমূহের অন্তর্ভুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
- জমিদাররা ব্রিটিশ শাসনে ভূমির মালিক হয়ে কৃষকদের শোষণের পথ খুলে দেয়।
- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় শিল্পের অর্থনৈতিক পতন ঘটায়।
- মারে সিস্টেম (১৮২২) স্থায়ী বন্দোবস্তের তুলনায় অধিক নমনীয় রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল।
রাজস্ব ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে পার্থক্য
| সিস্টেম | প্রবর্তক | মূল বৈশিষ্ট্য | প্রভাব |
|---|---|---|---|
| স্থায়ী বন্দোবস্ত | লর্ড কর্নওয়ালিস | চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারিত রাজস্ব | অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কৃষক শোষণ |
| রাজস্ব চাষ | ব্রিটিশ কোম্পানি | রাজস্ব ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের কাছে লিজ দেওয়া | দুর্নীতি, আর্থিক অস্থিরতা |
| মারে সিস্টেম | লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক | ফসলের উৎপাদন অনুযায়ী নমনীয় | রাজস্ব আদায় উন্নত, কৃষকের বোঝা কম |
সারসংক্ষেপ (দ্রুত পুনর্বীক্ষণ)
- বাংলায় বাণিজ্যিক অধিকার ব্রিটিশ সম্প্রসারণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামরিক বিজয় ও অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
- স্থায়ী বন্দোবস্ত ও মারে সিস্টেম-এর মতো ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা অর্থনীতিকে গঠন করে।
- জমিদাররা কোম্পানি ও কৃষকদের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে ওঠে।
- ব্রিটিশ নীতিগুলি বাংলায় অর্থনৈতিক পতন ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়।